• মঙ্গলবার   ১৫ জুন ২০২১ ||

  • আষাঢ় ১ ১৪২৮

  • || ০৫ জ্বিলকদ ১৪৪২

জাগ্রত জয়পুরহাট

জয়পুরহাটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২১  

সুজলা সুফলা, শস্য শ্যামলা আছে আমার বুকে তাই কৃষাণ কৃষাণী, শ্রমিক সবসময় ব্যস্ত থাকে। আমার বুকে আছে বারো শিবালয়, আছে গোপীনাথপুর মন্দির। আরও আছে নান্দাইল ও আছরাঙ্গার দিঘী, পাথরঘাটাসহ আছে লাকমা রাজবাড়ী। আরও আছে নিমাই পীরের মাজার ও দুয়ানী ঘাট, তাই সবাই ডাকে আমায় জয়পুরহাট।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোল ঘেষা রাজশাহী বিভাগের সবচেয়ে ছোট জেলা জয়পুরহাট। পূর্বে (১৮২১-১৯৮৪ পর্যন্ত) জেলাটি বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর বগুড়া জেলা থেকে পৃথক হয়ে জয়পুরহাট জেলা গঠিত হয়। যার আয়তন ৯৬৫.৪৪ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা প্রায় ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার ৪৯৫ জন। যার ৪,৭৩,৫২০ জন পুরুষ ও ৪,৬৪,৯৭৫ জন মহিলা।

এ দেশের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত জয়পুরহাটের ইতিহাস খুবই অস্পষ্ট ছিল। কারণ এই সময় ভারতবর্ষের ইতিহাসে জয়পুরহাটের কোনো স্বতন্ত্র ভৌগোলিক অবস্থান ছিল না।

সেই সময় জয়পুরহাট গৌড় পাল ও সেন রাজাদের রাজ্যভুক্ত ছিল। পূর্বে বর্তমান জয়পুরহাটের নাম ছিল বাঘাবাড়ী হাট, পরবর্তী সময় কাগজপত্রে গোপেন্দ্রগঞ্জহাট লেখা হতে থাকে। সে সময় জয়পুরহাট স্থানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। বর্তমান জয়পুরহাট ও পাঁচবিবি উপজেলার গ্রামসমূহ নিয়ে এক সময় লালবাজার থানা গঠিত হয়েছিল। লাল বাজার থানাটির বর্তমান নাম করিমনগর।

বৃটিশ শাসনামলে ১৮২১ সালে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার চারটি, রংপুর জেলার দুইটি, দিনাজপুর জেলার তিনটি নিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত হয়েছিল তারই অংশ নিয়ে ১৯৭১ সালে জয়পুরহাট মহকুমা এবং পরবর্তী সময় জয়পুরহাট জেল গঠিত হয়।

১৮৫৭ সাল থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত দেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময় দেশে রেল লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয় ১৮৮৪ সালে কলকাতা হয়ে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত ২৯৬ মাইল রেলপথ বসানোর কাজ শেষ লোকজনের উঠানামা ও মালামাল আমদানি রপ্তানির সুবিধার জন্য ৪-৭ মাইল পর পর রেল স্টেশন স্থাপন করা হয়।

সান্তাহারের পর তিলকপুর, আক্কেলপুর, জামালগঞ্জ এবং বাঘাবাড়িতে স্টেশন স্থাপিত হয়। সে সময় রেল স্টেশনকে জয়পুর গভর্নমেন্ট ক্রাউনের নাম অনুসারে রাখা হয় জয়পুরহাট রেল স্টেশন এবং জয়পুরের সঙ্গে হাট লাগানোর কারণ হলো জয়পুর স্টেশনের পাশেই ছিল যমুনা নদী। সেই নদীর তীরে বসত মূলবাজার এই বাজারকে বলা হতো যমুনার হাট। এই হাটকে জয়পুরের সঙ্গে যুক্ত করে লিখা হতো জয়পুরহাট।

পরবর্তী সময় রেল স্টেশনের সাথে পোস্ট অফিসের নাম রাখা হয় জয়পুরহাট এবং এই নামটি প্রসিদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু সরকারি কাগজপত্রে এর আসল নাম গোপেন্দ্রগঞ্জ বহাল থাকে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিপর্যয়ের ফলে যমুনার নাব্যতা কমে যায় এবং এতে বেশ হুমকির মুখে পড়ে লালবাজার থানা। তখন ভারত সরকারের নির্দেশে ১৮৬৮ সালে ১৬ মার্চ তারিখে লালবাজার থানাকে যমুনার অন্য তীরে খসবাগুড়ী নামক গ্রামে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময় ঐ স্থানের নাম ছিল পাঁচবিবি। পরবর্তী সময় দমদমায় রেল স্টেশন স্থাপিত হলে থানাটিকে দমদমায় স্থানান্তরিত করা হয়। সেই সময় পাঁচবিবি নামটি বেশ প্রসিদ্ধ লাভ করায় দমদমা রেল স্টেশন ও থানার নাম রাখা হয় পাঁচবিবি রেল স্টেশন ও পাঁচবিবি থানা।

রেল লাইন বসানোর ফলে জনপদের চলাচলে অধিক সময় ও অর্থ ব্যয় বহুলাংশে কমে যায়। জয়পুরহাট রেল স্টেশন হওয়াতে ব্যবসা ও যাতায়াতের সুবিধার কথা চিন্তা করে বিত্তশালী ব্যক্তিরা। রেল স্টেশনের আশেপাশে বসতি গড়ে তোলে যার ফলে খঞ্জনপুর ও লালবজার হাটের বিলুপ্তি ঘটে। পরবর্তী সময় বাঘাবাড়িকে লিখিত হিসেবে গোপেন্দ্রগঞ্জ লিখা হতে থাকে। ১৯০৭ সালে বাঘাবাড়িতে একটি পৃথক থানা হয়। যার নাম হয় জয়পুরহাট থানা। এতে জয়পুরহাট ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। ফলে ১৯১৮ সালে জয়পুরহাট থানা ভবন নির্মিত হলে পাঁচবিবি থানাকে জয়পুরহাট থানার উত্তর সীমা রূপে নির্দিষ্ট করা হয়। জয়পুরহাট থানা হওয়ার পর ১৯২০ সালে ভূমি জরিপে এর একটি পৃথক নকশা অঙ্কিত হয়।

এভাবে জয়পুরহাট রেল স্টেশন ও জয়পুরহাট পোস্ট অফিস ব্যাপকভাবে প্রচলিত হতে থাকায় ১৯৭১ সালে ১লা জানুয়ারি জয়পুরহাট মহকুমার ভিত্তি স্থাপন করা হয়। যা পরবর্তী সময় ১৯৮৪ সালে জয়পুরহাট জেলা নামে ঘোষণা করা হয়।

১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জেলায় রয়েছে দুইটি সংসদীয় আসন, ৫ টি উপজেলা, ৫টি পৌরসভা ৩২টি ইউনিয়ন, ৯৯৮টি গ্রাম ও ৭৬২ টি মৌজা। ২টি সংসদীয় আসন হলো- জয়পুরহাট -০১ (জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি), জয়পুরহাট -০২ (আক্কেলপুর, কালাই ও ক্ষেতলাল)। যমুনা নদী ছাড়াও এখানে রয়েছে শ্রী নদী, চিরি নদী, হারাবতী/হারামতী নদী ও তুলশীগঙ্গা নদী এবং গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি খাল রয়েছে।

ধান, পাট, গম, আলু, আখ ও নানা রকমের শাক-সবজি জন্মানোর এই জেলাতে জন্ম হয়েছে কবি আতাউর রহমান, জমিদার গোলাম আকবর চৌধুরি, বিতর্কিত রাজনীতিবিদ আব্বাস আলী খান, নাসির মন্ডল মহসীন আলী দেওয়ান, মওলানা সাদ ওয়াক্কাস, মফিজ উদ্দিন চৌধুরী, মোখলেছুর রহমান, আবুল হাসনাত চৌধুরী, মহরুম গোলাম রাব্বানী, কণ্ঠশিল্পি শাহ্ নজরুল ইসলাম, কণ্ঠশিল্পি ফাতেমা-তুজ জোহরা, কণ্ঠশিল্পী খুরশিদ আলম, চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি।

বৃহত্তর নওগাঁ, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলার নিকটবর্তী এই ছোট জেলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক নান্দনিক ও ঐতিহাসিক স্থান। গোপীনাথপুর মন্দির, আছরাঙ্গার দিঘী, আক্কেলপুর বধ্যভূমি, হিন্দা- কসবা শাহী জামে মসজিদ, নান্দাইল দিঘী, হয়রত শাহ্ কামাল পীর মুকাদ্দাস গাজী (র.) মাজার,লাকমা রাজবাড়ি, পাথরঘাটা, নিমাই পীরের মাজার (বর্তমান নাম হয়রত মোহাম্মাদ নাসির উদ্দিন শাহ্ (র.), বারো শিবালয়, দুয়ানী ঘাট, পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি, খোরপা চোরা, শিশু উদ্যান, বাস্তবপুরী প্রভৃতি স্থান।

এ জেলার কিছু নাম মনকে দোলা দিয়ে যায় তা হলো হঠাতপাড়া, উপর বস্তা, নিচে বস্তা, ভুলকাপাড়া, লেকিপাড়া,, ডোলপাড়া, শিয়ালমারি, চ্যাটখুর, বালাখুর, বেড়াখাই, গুড়নী, চিকনমাটিয়াসহ বেশ কিছু চমকপ্রদ নাম।

জয়পুরহাট জেলার শিক্ষার হার ৬৪ শতাংশ। এ জেলায় সরকারি কলেজ- ৪টি, বেসরকারি কলেজ- ৩৯টি, মহিলা ক্যাডেট কলেজ- ১টি, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়- ৪টি, বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়- ১৬১টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়- ২৬৩টি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়- ৮৭টি, সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- ১টি, বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- ১৪টি, কামিল মাদ্রাসা- ৪টি, ফাজিল মাদ্রাসা- ১০টি, আলিম মাদ্রাসা- ১৭টি, দাখিল মাদ্রাসা- ৮০টি, পিটিআই- ১টি, মডেল মাদ্রাসা- ১ টি রয়েছে, টিটিসি ১ টি রয়েছে। জয়পুরহাট সদর থানা উচ্চ বিদ্যালয় জেলার মধ্যে অন্যতম একটি বিদ্যালয়

সুজলা সুফলা এই জেলা বেশ সুনাম লাভ করছে। জেলাটির মনোরম পরিবেশ মনকে বেশ দোলা দেয়। মায়ের মতো এই জেলাতে জন্মে আমরা গর্বিত। তাই বলছি, ধন্য হয়েছি জন্মে তোমার কোলে এই ইতিহাস, তুমি কোথায় ছিলে। তোমার মতো জেলা পেয়েছি, পেয়েছি কত শত মাঠ তাই তুমি সত্যিই জয়পুরহাট।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট