• বুধবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪২৯

  • || ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

সুস্বাদু পাহাড়ি খাবার বাঁশ কোড়ল

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২  

পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটিকে বলা হয়ে থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ জেলা। অর্থাৎ পাহাড়ের এই জেলাটিকে প্রকৃতি যেন তার দুহাত উজাড় করে দিয়েছে। এখানে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ ও সুউচ্চ পাহাড়। কৃষিজ এবং বনজ নানান সম্পদে পরিপূর্ণ রাঙ্গামাটি। এখানে পাওয়া যায় নানারকম পাহাড়ি সবজি। তেমনই একটি ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু সবজির নাম ‘বাঁশ কোড়ল’। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ব্যাম্বু শ্যুট’। 

বাঁশ কোড়ল সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই অজানা। বিশেষ করে সমতলের মানুষজনের। বাঁশ যে খাওয়াও যায় এই ব্যাপারটিই অনেকে বিশ্বাস করতে চান না। কিন্তু এই বাঁশ কোড়ল যে পাহাড়ি জেলাগুলোতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর কাছে এক সুস্বাদু রসনাবিলাসের খোরাক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঁশ কোড়ল শুধু সুস্বাদু ও মজাদার তাই নয়, এর রয়েছে নানাবিধ পুষ্টিগুণ। তাই যুগ যুগ ধরে পাহাড়িদের কাছে জনপ্রিয় এক খাবার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে এই বাঁশ কোড়ল।

বাঁশ কোড়ল হলো মূলত ছোট বা কচি বাঁশ। বাঁশের ছোট চারার পাঁচ থেকে ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত ছোবরার ভেতরে যে কচি অংশটি থাকে মূলত সেটিই বাঁশ কোড়ল, যা খাওয়া হয়। বাঁশ কোড়লের মূল খাদ্য উপাদানটি থাকে ছোবরা দিয়ে মোড়ানো। বাঁশ কোড়ল বাগান থেকে সংগ্রহ করে আনার পর এটির খোসা ছড়িয়ে তারপর মূল অংশটি বের করে আনা হয়।
 
পাহাড়ে বসবাসরত সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এই বাঁশ কোড়ল। তারা এটিকে বলে ‘বাচ্ছুরি’। পাশাপাশি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাঝেও এর জনপ্রিয়তা কম নয়। যেমন মারমারা এটিকে বলে ‘মহই’ এবং ত্রিপুরারা বলে ‘মেওয়া’। পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় সব জায়গায়ই এই সবজি দেআ যায়। 
 
বছরের মে থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত পাহাড়ের বাজারগুলোতে বাঁশ কোড়ল বেশি পাওয়া যায়। মূলত বর্ষাকালে যখন মাটি নরম থাকে, তখন বাঁশগুলো বাড়তে শুরু করে এবং ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা হওয়ার পরই খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায়। তখন পাহাড়ের বাঁশ বাগানগুলো থেকে এই সবজি সংগ্রহ করে পাহাড়ি বাজারগুলোতে বিক্রি করতে নিয়ে আসেন বিক্রেতারা।
 
এই বাঁশ কোড়লেরও রয়েছে বিভিন্ন প্রকারভেদ। পাহাড়ে বিভিন্ন ধরনের বাঁশ পাওয়া যায়। যার মধ্যে মিতিঙ্গা বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, মুলি বাঁশ, বাইজ্জ্যে বাঁশ, ডলু বাঁশ, কালিছুরি বাঁশ অন্যতম। এর মধ্যে মুলি বাঁশ কোড়ল সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু হওয়ায় বাজারগুলোতে এর চাহিদা এবং দাম বেশি। মুলি বাঁশ কোড়ল আকারে চিকন ও যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় এটি প্রায় এক ফুট থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত লম্বা হলেও এটি খাওয়া যায়। মুলি বাঁশ কোড়লের আরেকটি বড় গুণ হচ্ছে এটি দিয়ে অনেকগুলো রেসিপি তৈরি করা যায়। পাহাড়ি এলাকায় যেসব বাঁশ কোড়ল দেখা যায়, তার প্রতিটি প্রজাতিই প্রায় খাওয়ার যোগ্য অর্থাৎ কোনটি বিষাক্ত নয়।  

dhakapost

বর্তমানে বাঁশ কোড়ল শুধু পারিবারিক খাদ্য তালিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে এটি এখন রাঙ্গামাটির বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের প্রধান আকর্ষণে রূপ নিতে শুরু করেছে। পর্যটকদের কাছেও দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পাহাড়ি এই সবজি। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এবং ভোজনরসিকদের কথা মাথায় রেখে রাঙ্গামাটির ঐতিহ্যবাহী রেস্টুরেন্টগুলো বাঁশ কোড়লের নানান পদের রেসিপি তৈরি করে থাকে।

রাঙ্গামাটির সমাজ্জ্যে রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক মাইকেল চাকমা বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙালিদের মধ্যেও বাঁশ কোড়ল খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাঁশ কোড়ল খেতে যেমন সুস্বাদু,  তেমনি অনেক রোগের জন্যও এটি খুব ভালো। যেমন এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাতে সাহায্য করে। আমরা প্রতিদিন ৭-৮ কেজি বাঁশ কোড়লের বিভিন্ন রেসিপি তৈরি করি। যার মধ্যে বাচ্ছুরি তাবা, বাচ্ছুরি ভাজি বা রান্না অন্যতম।

বাঁশ কোড়লের চাহিদা যে শুধু পাহাড়ি জেলাগুলোতে রয়েছে তা নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এই সবজিটির রয়েছে দারুণ জনপ্রিয়তা। থাইল্যান্ড, চীন, ভারত, মিয়ানমার, জাপানসহ নানা দেশে এই খাবারটির প্রচলন থাকায় এর বেশ চাহিদা রয়েছে। চীন ও থাইল্যান্ডে ‘ব্যাম্বু শ্যুট’, মিয়ানমারে ‘মায়োহেট’, আসামে ‘বাঁহ গাজ/খবিচা’, নেপালে  ‘থামা’, ইন্দোনেশিয়ায় ‘রিবাং’, জাপানে ‘তেকোনাকো’ নামে এই খাবার পরিচিত।

শহরের সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজার বনরুপা বাজারে বাঁশ কোড়ল বিক্রি করতে আসা পাহাড়ি নারী জয়া চাকমা বলেন, আমরা পাহাড়ের অনেক ভেতর থেকে এই বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে আনি। বর্ষাকালে মোটামুটি ভালোই বাঁশ কোড়ল হয় পাহাড়ে। তবে ইদানিং নির্বিচারে বাঁশ কেটে ফেলায় এবং পাহাড়ি ভূমি কমে যাওয়ায় বাঁশ কোড়লের পরিমাণ দিন দিন কমছে।
 
আরেক পাহাড়ি নারী বিক্রেতা ত্রিবেণী চাকমা বলেন, আমি মিতিঙ্গা বাঁশ আর ডুলু বাঁশ বিক্রি করতে এনেছি। এসব বাঁশ কোড়ল সংগ্রহ করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। পাহাড়ি জঙ্গলের অনেক গহীনে গিয়ে আনতে হয়। তারপর বাজারে নিয়ে আসি বিক্রি করার জন্য। আমরা পাহাড়িরা সাধারণত নাপ্পি, সিদল এবং শূকরের মাংসের সঙ্গে বেশি খাই। তবে এটি অন্যান্য মাংসের সঙ্গেও খেতে দারুণ। 

দিন দিন বাঁশ কোড়লের চাহিদা বাড়তে থাকায় অনেকেই এখন অবাধে বাঁশ কেটে নিয়ে আসছেন বাজারে বিক্রির জন্য। পাশাপাশি অধিক মুনাফার লোভে অনেক বাঁশ চোরাকারবারিও পাহাড় থেকে অবৈধ উপায়ে বাঁশ সংগ্রহ করে ধ্বংস করে দিচ্ছে বাঁশবাগানগুলোকে।

রাঙ্গামাটির পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের পরিচালক ফজলে এলাহী বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বাঁশ নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঁশ কোড়ল পাহাড়ের খুবই জনপ্রিয় একটি খাবার। কিন্তু অত্যাধিক পরিমাণে বাঁশ আহরণের ফলে এখানকার কর্ণফুলী পেপার মিল, বাঁশের আসবাবপত্র, শিল্পসহ বাঁশের ওপর নির্ভরশীল শিল্পগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। তাই বাঁশ শিল্পকে বাঁচাতে হলে অত্যাধিক পরিমাণে বাঁশ আহরণে নিরুৎসাহিত করতে হবে সচেতন সমাজকে। এই বিষয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাহাড়ের প্রাণ প্রকৃতি ও পরিবেশকে বাঁচাতে হলে অতিমাত্রায় বাঁশ কোড়ল খাওয়া ও আহরণ বন্ধের বিকল্প নেই। 

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট