• মঙ্গলবার   ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ||

  • মাঘ ১৮ ১৪২৯

  • || ০৯ রজব ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

মাছের ফেলনা আঁশ আনছে ডলার

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০২২  

ফেলনা বস্তু মাছের আঁশ এনে দিচ্ছে ডলার। শুনতে অবাক লাগলেও অনেকেই এখন এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যশোরের মাছ বাজারগুলোর বটি ওয়ালারা ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন এ আঁশ। তারপর এক-দুই হাত ঘুরে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ আঁশ চলে যাচ্ছে জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোয়।

পরিসংখ্যান বলছে,  প্রতি বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছের আঁশ রফতানি হচ্ছে দেশ থেকে। বিদেশে এ আঁশ দিয়ে তৈরি হয় ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক জিনিসপত্র, কৃত্রিম কর্নিয়া ও কৃত্রিম হাড়, ওষুধ, মাছ ও মুরগির খাবার, নেইলপালিশ, লিপস্টিকসহ নানা প্রসাধনি।

যশোরের মাছবাজার ঘুরে দেখা গেছে, যশোরে মাছের আঁশের চাহিদা এখন অনেক বেশি। বড় বাজারে নিয়িমিত মাছ কাটেন আল আমিন (বটি ওয়ালা)। মাছ কাটতে প্রতি কেজিতে তিনি নেন ১০ টাকা করে। এর বাইরে মাছের আঁশ বিক্রি করে বছরে কমপক্ষে বাড়তি আয় করছেন ২০ হাজার টাকা।

মাছ কাটেন এমন আরও একজন বাবুল হোসেন। তিনি জানান, শুধু আঁশ নয়, মাছের নাড়িভুঁড়িও বিক্রি হয়। নাড়িভুঁড়ি ব্যবহার করা হয় মাছের খাদ্য হিসেবে। এগুলো শুকিয়ে বিদেশেও পাঠানো হয়। মাছের ফুলকো শুকনো করে বিদেশে সুপ তৈরি হয়। এছাড়া মাছের ফুলকা, পিত্ত, চর্বি দিয়ে আরো অনেক রকমের জিনিস তৈরি হয়।

শহরের শুধু বড় বাজার নয়, আশপাশের সব বাজারের বটি ওয়ালারাও নাড়িভুঁড়ি ও আঁশ বিক্রি করে থাকেন। কেউ কেউ বাসাবাড়ি থেকেও মাছের আঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

শহরের বড় মাছ বাজারের একজন আড়তদার মোহাম্মাদ আলী, যিনি প্রতিদিন বিভিন্ন বাজার থেকে কয়েক মণ মাছের আঁশ সংগ্রহ করেন। তিনি জানান, আঁশ শুকিয়ে তিনি চট্টগ্রামের হক সাহেব, সিরাজ হাজী, আনোয়ার হোসেনসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যবসায়ির কাছে বিক্রি করেন। এ আঁশ মণ প্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি। তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা এই আঁশ চট্টগ্রামের আড়তদাররা বিদেশে রফতানি করেন।

তিনি আরও জানান, দেশে এ ব্যবসা প্রথম শুরু করেন ঢাকার শামসুল আলম নামে এক ব্যবসায়ী। যিনি তার জাপানি বন্ধুর কাছ থেকে পরামর্শ পেয়ে মাছের আঁশের ব্যবসা শুরু করেন।

ব্যবসায়িরা জানান, আঁশ সংগ্রহ করার পর সেই আঁশগুলো পরিষ্কার পানিতে  অথবা অল্প গরম পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এমনভাবে পরিষ্কার করা হয় যেন মাছের গায়ে লেগে থাকা তৈলাক্ত পদার্থ সম্পূর্ণ ধুয়ে যায়। তারপর সামান্য রোদে শুকানোর পর ঝরঝরে করা হয়। এরপরই বিক্রির উপযোগী হয়। অবশ্য কেউ কেউ মিক্সার গ্রান্ডারে গুঁড়ো করে পাউডার আকারেও মাছের আঁশ বিক্রি করেন।

ব্যবসায়িদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাছ হিসেবে দাম ভিন্ন হয়। রুই, কাতলার মত বড় মাছের আঁশের দাম একটু বেশি। চিংড়ি মাছের মাথার খোসার দাম আর একরকম। মাছের ফুলকার দামও আলাদা। প্রতিটা মাছের চর্বিও দাম ভিন্ন।

রফতানি প্রাক্রিয়াজাতকরণ সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১০-১২ জন ব্যক্তি আঁশ রফতানি করেন। তবে এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ। প্রতি বছর ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছের আঁশ সাত-আটটি দেশে রফতানি হয়। প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার টন আঁশ রফতানি হয় জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোয়। সেখানে মাছের আঁশ থেকে কোলাজেন ও জিলেটিন তৈরি করা হয়। ওষুধ, প্রসাধন সামগ্রী, ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরিতে মাছের আঁশ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কোলাজেন ও জিলেটিন মাছের আঁশ দিয়ে তৈরি হয়, যা ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীতে কাজে লাগে।

মাছের আঁশ ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার যদি এ বিষয়ে নজর দেন, তাহলে এ ব্যবসার আরও পরিধি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান জানান, বিদেশে মাছের আঁশের বেশ চাহিদা আছে। একটু চেষ্টা করলেই এই শিল্পকে সামনের দিকে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়। সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট