মঙ্গলবার   ০৫ মার্চ ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১৭:২৬, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

হারানো মসজিদ: ১৩৭৭ বছর পুরোনো লালমনিরহাটের ‘রহস্যময়’ মসজিদ

হারানো মসজিদ: ১৩৭৭ বছর পুরোনো লালমনিরহাটের ‘রহস্যময়’ মসজিদ
সংগৃহীত

লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস গ্রামটি খুবই শান্ত-শীতল। দিগন্ত বিস্তৃত সারি সারি ফসলের মাঠ। খানিক দূরত্ব পর পর এক-দুটি বসত-বাড়ি। নেই কোলাহল, ঘনবসতিপূর্ণও নয়। প্রশ্ন হলো, এই গ্রামে হাজার বছর আগে এই গ্রামে কি কোনো জনবসতি ছিল? কিংবা এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের আগমন ঘটেছিল কবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ১৯৮৬ সালেই। সেই প্রত্যন্ত গ্রামের ‘আড়ায়’ লুকিয়ে ছিল ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়। আড়া বলতে স্থানীয়রা জঙ্গল ও ঝোঁপঝাড়কেই বুঝায়। জঙ্গলটি পরিষ্কার করার সময় কিছু প্রাচীনকালের ইট বেরিয়ে আসে। মাটি ও ইট সরাতে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায় মসজিদের ভিত।

কথা হলো, এরকম পোড়া মাটির স্থাপত্যতো বাংলাদেশে এর আগেও অনেক পাওয়া গেছে। তাহলে এটার বিশেষত্বটা কোথায়? রহস্যটা হলো, এই মসজিদ কে বা কারা নির্মাণ করলো সেটা নিয়ে। সেইসব পোড়া মাটির ফলক কার্বন ডেট করে প্রত্নতাত্ত্বিকবিদরা নিশ্চিত হয়েছে, এর নির্মাণকাল আনুমানিক ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি বা ৬৯ হিজরিতে। এর মানে এটি এক হাজার ৩৭৭ বছর আগের মসজিদ!

মসজিদের ধ্বংসস্তূপে যে শিলালিপি পাওয়া যায় তাতে সুস্পষ্টভাবে আরবিতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরি ৬৯ সাল।’ শিলালিপির সূত্রে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ৬৯ হিজরিতে নির্মিত হয়েছে এ মসজিদটি। খননের পর মসজিদের মেহরাব এবং মসজিদসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠ ও খুতবার মিম্বরও আবিষ্কৃত হয়। এলাকার লোকজন এ মসজিদটির নাম দিয়েছেন ‘হারানো মসজিদ’।

ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, সাহাবি হজরত আবু ওয়াক্কাস (রা.) এ অঞ্চল দিয়েই চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বর্তমানে চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে তার নির্মিত মসজিদ ও সমাধি রয়েছে। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল দাবি করেন, খ্রিষ্টপূর্ব সময় থেকে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীনের মধ্য দিয়ে আরব ও রোমান বণিকদের বাণিজ্য বহরের যাতায়াতের অনেক প্রমাণ রয়েছে তার কাছে। এ হারানো মসজিদ হতে পারে সাহাবি আবু ওয়াক্কাস (রা.) নির্মাণ করেছেন।

 

শিলালিপিতে সুস্পষ্টভাবে আরবিতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরি ৬৯ সাল।

শিলালিপিতে সুস্পষ্টভাবে আরবিতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরি ৬৯ সাল।

 

তবে ৬৯০ খ্রিষ্টাব্দের এই মসজিদ নির্মাণ অবাক হওয়ার কিছু নয় কারণ বাংলায় সভ্যতার বিকাশ সেই খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে যা কিনা প্রাচীন রোমান, গ্রিক, পারস্যের সঙ্গে তুলনাযোগ্য। এই মসজিদের নির্মাণের সময় বাংলায় খড়্গ বংশের শাসন চলছিল; যারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী।

ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চল নানান উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে রামদাস গ্রাম জনশূন্য হতে থাকে। বিশেষ করে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের এই অঞ্চলকে মিলিটারি বেইজ এবং পড়ে লালমনিরহাটে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর ঘাটি নির্মাণ করা দরুণ বহু স্থানীয় লোকজনকে বসতবাড়ি ত্যাগ করতে হয়। ফলে জনমানবহীন গ্রামে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের ভেতর হারিয়ে যায়। স্থানীয় মানুষজনে কাছে এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘মোস্তের আড়া’, এর মানে জঙ্গলের ভেতর মসজিদ। এই নামের সার্থকতা পরিষ্কার হয় মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। 

যেখানে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে সেখানেই তারা গড়ে তুলেছে নতুন আরেকটি মসজিদ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সপ্তদশ শতাব্দীর সমসাময়িক বাংলার এবং আরবের আর্কিটেকচার রেফারেন্স নিয়ে একটা কাল্পনিক মসজিদের মডেল তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নাও থাকতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিক রেফারেন্স ঠিক রেখে মসজিদটির একটা কাল্পনিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে ‘হারানো মসজিদ’।

স্থানীয় অধিবাসী এবং ‘হারানো মসজিদ কমিটি’র সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির দাবি অনুযায়ী, ধ্বংস হয়ে যাওয়া মসজিদটি নির্মাণ করেছেন মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর একজন সাহাবা।

সূত্র: ডেইলি-বাংলাদেশ

সর্বশেষ

জনপ্রিয়