• মঙ্গলবার   ০৬ ডিসেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২২ ১৪২৯

  • || ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর ২০২২  

সুনীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) অপার সম্ভাবনা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। নৌপথ ও সমুদ্র অর্থনীতি হবে আগামী বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী উৎস। বিশাল সামুদ্রিক এলাকা জয়ের পর সমুদ্র অর্থনীতি ঘিরে নতুন স্বপ্ন হাতছানি দিচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত হতে পারে ব্লু-ইকোনমি। ব্লু -ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্র সম্পদ নির্ভর অর্থনীতি। সামুদ্রিক সম্পদের এক বিশাল আধার হচ্ছে বঙ্গোপসাগর। সামুদ্রিক সম্পদ হতে পারে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা বলছেন, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমার মামলা আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তির পর আট বছর আগে বঙ্গোপসাগরে জলরাশির সুবিশাল এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ২শ' নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহীসোপান অঞ্চলে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ ও সার্বভৌম অধিকার সুনিশ্চিত করেছে আদালতের রায়। যার আয়তন প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান। তবে বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পরও ব্লু ইকোনমির সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এই বিস্তীর্ণ সমুদ্রের নীল জলরাশির তলদেশে যে বিশাল সম্পদ লুকিয়ে আছে, তা হতে পারে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ বা সঞ্চয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্লু ইকোনমিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রথাগত এবং উদীয়মান বেশ কিছু শিল্প যেমন- জাহাজ চলাচল, নৌ ও সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, মেরিন কন্সট্রাকশন ও ড্রেজিং, সমুদ্রবর্তী গ্যাস ও তেল আহরণ, মেরিন গবেষণা ও শিক্ষা, ফিশিং, সি-ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামুদ্রিক সম্পদ রয়েছে। ব্লু ইকোনমির ওপর ৩শ' কোটির বেশি মানুষ কম-বেশি নির্ভরশীল এবং এটি বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি। ক্রমবর্ধমান এই অর্থনীতির আকার ২০৩০ সাল নাগাদ ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সমুদ্র বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব এবং তথ্যের অপ্রতুলতার অভাবে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ৮০ ভাগ এলাকার সম্পদের হিসাব এখনো অজানা। বদ্বীপ মহাপরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাতে সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। সমুদ্রের সুবিশাল জলরাশির ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সমুদ্র বা নীল অর্থনীতির এক অপার সম্ভাবনা। যদিও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ব্লু ইকোনমি নিয়ে কিছু প্রস্তাবনা রয়েছে। তবে সবকিছুই এখনো পরিকল্পনার মধ্যেই আটকে আছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ সমুদ্রনির্ভর। অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রসম্পদ থেকে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। মঙ্গলবার রাশিয়ার সচি শহরে আয়োজিত পরমাণু শিল্প বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন এটম এক্সপো ২০২২ এর সমাপনী দিনে 'নীল অর্থনীতিঃ টেকসই ভবিষ্যতের লক্ষ্যে সরকার, ব্যবসা ও বিজ্ঞান' শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রসাটমের লজিস্টিক ইন্টিগ্রেটর 'রুসাটম কার্গো' গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রসাটম এটমএক্সপো আয়োজন করে। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা ব্লু ইকোনমিকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি পরিকল্পনা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন। গোলটেবিল বৈঠকে রাশিয়া, মিসর, ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশেষজ্ঞরা সমুদ্র অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা, চ্যালেঞ্জসমূহ এবং এর উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা সমুদ্র অর্থনীতির বৈশ্বিক এবং আন্তঃসীমান্ত প্রকৃতি তুলে ধরেন এবং অভিমত ব্যক্ত করেন যে সরকার, ব্যবসা ও বিজ্ঞানের জন্য এটি একটি সহযোগিতার পস্ন্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মস্কোর লামানোসভ স্টেট ইউনিভার্সিটির মেরিন গবেষণা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নিকোলাই সাবালিন বাংলাদেশের সমুদ্রের তলদেশে পস্ন্যাটিনাম, কোবাল্ট, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, সিসা, জিঙ্ক ও সালফাইড রয়েছে বলে জানান। বঙ্গোপসাগরে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালের সন্ধান পাওয়া গেছে। বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর তলদেশে মহামূল্যবান ধাতু ইউরেনিয়াম রয়েছে, এ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরে ৪৯৪ প্রজাতির মাছসহ ৩৮ প্রজাতির চিংড়ি আছে। মূল্যবান মাছ ছাড়াও সমুদ্রসীমায় নানা ধরনের প্রবাল, গুল্মজাতীয় প্রাণী, ৩৮ প্রজাতির চিংড়ি, সাত প্রজাতির লবস্টার, ২৩ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৩৪৩ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক পাওয়া যায়। উপকূলীয় অঞ্চলের ছয় লাখ জেলের জীবিকার উৎস্য সমুদ্র। মিসরের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটি অফ ওশেনোগ্রাফি এন্ড ফিশারিজের অধ্যাপক মোহামেদ আহমেদ বলেন, ব্লু ইকোনমিতে বিনিয়োগকালে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মেরিন ইকোসিস্টেমের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে পরিবেশ কেন্দ্রিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতা আবশ্যক। ভারতের বীড়লা ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রুদ্র প্রসাদ প্রধান ব্লু ইকোনমির ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ভারত মহাসাগর সাত কোটি বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এর মাধ্যমে যুক্ত রয়েছে ৪০টি দেশ। এটি বিশ্বে তেল পরিবহণ ও বাণিজ্য রুটগুলোর মধ্যে অন্যতম। তার মতে, ভারত অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমুদ্র ও মহাসমুদ্রগুলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পস্ন্যাটফর্ম মনে করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর উপ-প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা রাজ জিৎ সিং ওয়ালিয়া বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড ব্লু ইকোনমির উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সামুদ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংস্থাটি নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে রসাটমের ব্যবসা উন্নয়ন পরিচালক ইকাতেরিনা লিয়াকোভা বলেন, রসাটমের জন্য ব্লু ইকোনমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে। সর্বাধিক অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন এবং অঞ্চলটির বায়োস্ফেয়ার রক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, ব্যবসা এবং বিজ্ঞান সম্মিলিতভাবে শুধুমাত্র আর্কটিক নয়, সকল সামুদ্রিক অঞ্চলগুলোর জন্য অর্থনীতির একটি মডেল তৈরিতে কাজ করার আহ্বান জানান।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট