মঙ্গলবার   ০৫ মার্চ ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ০৭:১৭, ৩০ মার্চ ২০২৩

একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকছে না ইউএনওদের

একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকছে না ইউএনওদের

উপজেলা পরিষদে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইনের ৩৩ ধারা অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে বলে রায় দিয়েছেন আদালত। এই রায়ের ফলে উপজেলা চেয়ারম্যানদের ওপর ইউএনওদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকল না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। এখন থেকে উপজেলা পরিষদে ইউএনওরা সাচিবিক সহায়তা দেবেন।

গতকাল বুধবার এই রায় দেন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের দ্বৈত বেঞ্চ। উপজেলা পরিষদ আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা তিনটি রিট নিষ্পত্তি করে এই রায় দেন উচ্চ আদালত।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন, হাসান এম এস আজিম ও মো. মিনহাদুজ্জামান লিটন ও আইনজীবী ইয়াসমিন আক্তার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস।

যেভাবে ৩৩ ধারার সংশোধন ও আপত্তি : ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার (উপজেলা অধ্যাদেশ) বিলুপ্ত করে উপজেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮ সংশোধন করে সরকার। ওই আইনে ইউএনওকে উপজেলা পরিষদের সচিব করা হয়। তখন ইউএনওরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানান, আইন সংশোধনের মাধ্যমে তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। পরে উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রবল আপত্তির মুখে ২০১১ সালে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে ইউএনওদের ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ করা হয়। উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ (২০১১ সালে সংশোধিত)-এর ৩৩(১) বলা আছে, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হইবেন এবং তিনি পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করিবেন।’ আর ৩৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিপালন এবং বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য কার্যাবলি পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সম্পাদন করিবেন।’ আইন সংশোধন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পরিষদের ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ করা নিয়ে পরিষদের চেয়ারম্যানরা দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমানে উপজেলা পরিষদের বেশির ভাগ কমিটির সভাপতি হন ইউএনও। উপদেষ্টা রাখা হয় চেয়ারম্যানকে।

এ রকম বিধানে সৃষ্ট জটিলতায় উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও দুমকী উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ ও অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মনোহরদী উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান, গাজীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান রিনা পারভীন, কালিয়াকৈর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সেলিম আহম্মেদ ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদা আক্তার ২০২০ সালে ৭ ডিসেম্বর আইনটির ৩৩ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। আর আইনটির ১৩ ও ৩৩ ধারা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালের ১৫ জুন আরেকটি রিট করেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আব্দুল আজিজসহ তিন উপজেলা চেয়ারম্যান। ওই বছরই আগস্টে উপজেলা পরিষদ আইনের ২৯ ও ৩৩ ধারা চ্যালেঞ্জ করে আরেকটি রিট করেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মিনহাদুজ্জামান লিটন। তিনটি রিটেই ৩৩ ধারার বৈধতা প্রশ্নে রুল জারি করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পরিষদের ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ ঘোষণার ৩৩ ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। মন্ত্রিপরিষদসচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, আইনসচিবসহ বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়। এসব রুল একীভূত করে চূড়ান্ত শুনানির পর গতকাল রায় দেন উচ্চ আদালত। রায়ে ৩৩ ধারাসংক্রান্ত রুলটি যথাযথ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া : আইনজীবী হাসান এম এস আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিষদের ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’ স্বীকৃতির ৩৩  ধারাটি অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে উপজেলা পরিষদে ইউএনও সাচিবিক কার্যক্ষমতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। ফলে তাঁকে উপজেলা পরিষদের জবাবদিহির মধ্যে আসতে হবে।’

রিটকারী আইনজীবী মো. মিনহাদুজ্জামান লিটন কালের কণ্ঠকে বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন ‘উপজেলা প্রশাসন’-এর ব্যানারে। এখন থেকে চিঠিপত্র থেকে শুরু করে কোনো কিছুতে ইউএনওরা ‘উপজেলা প্রশাসন’ লিখতে বা ব্যবহার করতে পারবেন না। উপজেলা পরিষদ লিখতে বা ব্যবহার করতে হবে।”

আইনজীবী ইয়াসমিন আক্তার মিম বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ আইনের চেয়ারম্যান, ভাইস  চেয়ারম্যান ও নারী সদস্যদের অপসারণসংক্রান্ত ১৩(ক) ও (গ) উপধারা সম্পর্কে আদালত বলেছেন, এই দুটি উপধারা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। আর ‘উপজেলা পরিষদ আইনের চেয়ারম্যান, ভাইস  চেয়ারম্যান ও নারী সদস্যদের সাময়িক বরখাস্তসংক্রান্ত ১৩(খ) উপধারাটি সংশোধনযোগ্য বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।’

লিখিত অনুলিপি পাওয়ার পর রায় পর্যালোচনা ও সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপক্ষে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সিদ্ধান্ত নেবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মেহেদী হাসান চৌধুরী।

বিশেষজ্ঞ মত : এ রায় সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যে সমস্যার জন্য এই রায়, তা মূলত উপজেলা পরিষদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট। এর জন্য দুই পক্ষই দায়ী। এর অবসান হওয়া দরকার। বাস্তবতা হচ্ছে, উপজেলা পরিষদসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধি-বিধান কোনো পক্ষই যথাযথভাবে অনুসরণ করে না বা এগুলো পড়েও দেখে বলে মনে হয় না। ইউএনওরা আইনে যে ক্ষমতা দেওয়া নেই, তা প্রয়োগ করতে চান। উপজেলা পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউএনওরা। ভাইস চেয়ারম্যানদের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয় না। আমি দীর্ঘদিন এ সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছি। বিভাগীয় কমিশনার অফিসে স্থানীয় সরকার পরিচালক নামের একটি পদ আছে। ওই পদে যিনি রয়েছেন তাঁর কাজ হওয়া উচিত উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও—তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বিধি-বিধান সম্পর্কে অবহিত করা; কিন্তু তা করা হয় না। কিভাবে চলছে উপজেলার পরিষদ তার পর্যবেক্ষণও নেই। বিদ্যমান আইনে সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার সঠিক চর্চা অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘উচ্চ আদালতের এই রায় যুগান্তকারী। সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্ব জনপ্রতিনিধিদের কাছেই থাকা দরকার—এই রায়ে তা আবার প্রমাণিত হয়েছে।’

খুশি রিটকারী চেয়ারম্যান : রিটকারী দশমিনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ বলেন,  ‘উপজেলা পরিষদ বলতে কিছুই ছিল না। এত দিন ছিল উপজেলা প্রশাসন। আজ উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী হবে উপজেলা পরিষদ। উপজেলায় দুটি কমিটি ছাড়া সব কমিটির সভাপতি ছিলেন ইউএনও। আদালতের নির্দেশনায় এখন শুধু ইউএনওরা উপজেলা পরিষদের সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। আদালত জনপ্রতিনিধিদের করণীয় বিষয়টি বিবেচনা করে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন। এই রায়ে আমি খুশি।’

জাগ্রত জয়পুরহাট

সর্বশেষ

জনপ্রিয়