• বৃহস্পতিবার   ০৭ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২৩ ১৪২৯

  • || ০৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

সূর্যোদয়ের দেশে নারী উদ্যোক্তা মাসুমার ‘ঘি’

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ৩০ মে ২০২২  

চারদিকে মানুষের ঘরবন্দির খবর। আসছে করোনায় আক্রান্ত কিংবা মৃত্যুর সংবাদও। এর মাঝেই ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেন বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা মাসুমা ইসলাম (২৬)। ওই সময়ে অনলাইনে গরুর মাংসের আচার বিক্রি করে সফল হয়েছিলেন তিনি। আর এবার জাপানের বাজারে পণ্য রপ্তানির আদেশ পেয়েছেন।

সম্প্রতি এক আলাপ-চারিতায় মাসুমা জানালেন, গত জানুয়ারি থেকে প্রতিমাসে ১০০ কেজি করে ঘি রপ্তানি করছেন। রপ্তানি হচ্ছে রসুন ও মাংসের আচারও। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা তার।

মূলত শখের বশেই গৃহিণী থেকে উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন মাসুমা। বললেন, শুরুটা হয়েছিলো শখের বশেই। কিন্তু এখন সেটা নেশায় পরিণত হয়েছে। করোনার সময়ে জাপানসহ কয়েকটি দেশে পণ্য রপ্তানির প্রস্তাব পান তিনি। কিন্তু তখন পুঁজির সংকটের কারণে তা করতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘ বেশ হতাশায় ভুগছিলাম। তখন এ অবস্থায় পুঁজির সংকট নিরসন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে রাজশাহী উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) যোগাযোগ করি। কোনো জামানত ছাড়াই পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছে রাকাব। এই পুঁজি বিদেশে পণ্য রপ্তানিতে সহায়তা করে।’

রাকাবের বগুড়া করপোরেট শাখার আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক শাহিনুর ইসলাম বলেন, ছোট আকারে ব্যবসা শুরু করেছিলেন নারী উদ্যোক্তা মাসুমা ইসলাম। এ নিয়ে গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়। এ অবস্থায় তার ব্যবসার সম্প্রসারণে সহযোগিতা করতে পেরে আমরাও বেশ আনন্দিত।

জাপানে পণ্য রপ্তানির জন্য ইতোমধ্যে পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) থেকে সনদ নিয়েছেন মাসুমা। জানুয়ারি মাসের শুরুতেই তার আরএম ফুড কর্নারের উৎপাদিত ঘিয়ের প্রথম চালান জাপানে পাঠানো হয়।

মাসুমা বলেন, এর আগে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্য রপ্তানির প্রস্তাব আসে। কিন্তু বিএসটিআই সনদ না থাকায় ও পুঁজির সংকটের কারণে তখন পণ্য পাঠাতে পারিনি। বিএসটিআইর সনদের পাশাপাশি রাকাব থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ পাওয়ায় বিদেশে পণ্য রপ্তানির বাধা কেটেছে।

মাসুমা ইসলামের বাসা বগুড়া শহরের সিও অফিস কইগাড়ি এলাকায়। তার স্বামী রাজিবুল ইসলাম শহরের তারকা হোটেল নাজ গার্ডেনে সহকারী হিসাব ব্যবস্থাপকের পদে চাকরি করতেন। কিন্তু গত বছরের এপ্রিলে করোনার সংক্রমণের কারণে বিধিনিষেধ শুরু হলে হোটেলটি বন্ধ হয়ে যায়। তাতে চাকরি হারান রাজিবুল ইসলাম।

‘এ অবস্থায় দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ি,’ বলছিলেন রাজিবুল। আর তখনই এমন কঠিন পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে দাঁড়ান স্ত্রী মাসুমা। বাড়িতে নানা রকম আচার বানানো শুরু করেন তিনি। করোনার কারণে আচার বিক্রির জন্য কোনো দোকান ভাড়া নিতে পারেননি। তাই অনলাইনে পণ্য বিক্রি করতে শুরু করেন। অল্প দিনেই ভালো সাড়া পান। আচার বিক্রির ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। স্বামী রাজিবুলও এসে পাশে দাঁড়ান। বাড়িতে গড়ে তোলেন আচারের কারখানা।

মাসুমা জানান, শুরুতে আম, জলপাই, বরই, আমলকী, রসুন ও মরিচের আচার তৈরি করে বিক্রি করতেন। তবে সবচেয়ে বেশি ঝড় তোলে গরুর মাংসের আচার। অল্প দিনেই ব্যাপক সাড়া মেলে। এখন সারা দেশ থেকে ক্রয়াদেশ আসছে। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তাকে পণ্য সরবরাহ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন‘মাসে গড়ে ১০০ কেজি গরুর মাংসের আচার বিক্রি হয়। প্রতি কেজি এক হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এ ছাড়া প্রতি মাসে ৫০ কেজি রসুনের আচার ও ১০০ কেজি ঘি বিক্রি হয়’।
করোনা মহামারীতে মাসুমা-রাজিবুলের বাণিজ্যের যাত্রা শুরু। তবে তাদের যৌথজীবনের যাত্রাটাও শুরু হয় তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রাজিবুল ইসলামের সঙ্গে তার প্রথমে পরিচয় ও পরে বিয়ে হয়। করোনার সংকটে রাজিবুলের চাকরি চলে গেলে অনলাইন নামের প্রযুক্তি  সেবাই তাদের থমকে যাওয়া জীবনে আবার চলার পথ দেখায়। করোনা স্বামীর চাকরি কেড়ে নিলেও, প্রযুক্তি তাদের উদ্যোক্তা বানিয়েছে। নিজেদের ব্র্যান্ডের নাম দিয়েছেন আরএম ফুড কর্নার।

অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন মাসুমা-রাজিবুল দম্পতি।  পেয়েছেন উইমেন ইন্টারপ্রেনার অর্গানাইজেশন (উই) থেকে সফল উদ্যোক্তার সম্মাননা। আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি বদলে গেছে তাদের জীবন ব্যবস্থাও।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট