• বুধবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪২৯

  • || ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

সূর্যডিম থেকে ড্রাগন, বছরে বিক্রি ৫০ কোটি টাকা

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২২  

ফলের স্বর্গরাজ্য বিজয়নগর। পরিচিত কিংবা প্রচলিত কোন ফলটা নেই এখানে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তালিকাটা বেশ ছোট হবে। দেশি, বিদেশি যেকোনো ধরনের ফলের জন্যই যেন বিজয়নগরের মাটি বেশ উপযোগী। এখানকার মাটিকে অনেকে সোনার সঙ্গে তুলনা করেন। দৈনিক কালের কন্ঠের প্রতিবেদক বিশ্বজিৎ পাল বাবু-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত।

মানচিত্র বলছে, ভারত সীমান্তবর্তী একটি উপজেলা বিজয়নগর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত এ উপজেলা। জেলা শহর থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। সরাসরি রেল যোগাযোগ না থাকায় সড়ক ও নৌ-পথই জেলা থেকে এ উপজেলায় যাওয়ার প্রধান পরিবহনব্যবস্থা।

সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত হিসাবমতে, এ উপজেলায় প্রতিবছর অর্ধশত কোটি টাকার বিভিন্ন ফল উৎপাদন হয়। ভিন্নতায় হবে অর্ধশত ফল। উৎপাদিত ফলের মধ্যে লিচু, কাঁঠাল, আম, জাম, মালটা, কমলাসহ দেশি জাতের পাশাপাশি বিদেশি জাতের আপেল, আঙ্গুর, ড্রাগনও রয়েছে। এসব ফলের বেশিরভাগই এখন চাষ হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে।

ফলের এ রাজ্যে ‘নয়াদামান’ লটকন। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ হচ্ছে এ উপজেলায়। এ বছর প্রায় ১৮ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে। পাকতে শুরু করা লটকন বিক্রিও করছেন চাষিরা। লটকনের পাইকারি দর ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এ বছর কোটি টাকার মতো লটকন বিক্রির সম্ভাবনা আছে। ফলন ভালো হচ্ছে বিধায় লটকন চাষ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের মধ্যে। তৎপর আছেন কৃষি অফিসের সংশ্লিষ্টরা।

লটকনের অনেক পুষ্টি ও ওষধিগুণ রয়েছে। ভিটামিন ‘সি’তে ভরপুর এ ফল, যা প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় রাখা যায়। ১০০ গ্রাম পাকা লটকনে আছে খাদ্যশক্তি ৯১ কিলোক্যালোরি, যা কাঁঠালের প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া আমিষ ১.৪২ গ্রাম, চর্বি ০.৪৫ গ্রাম, ভিটামিন-সি ৫৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-বি ১-১০. ০৪ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-বি ২-০ রয়েছে। লটকনের বৈজ্ঞানিক নাম ব্যাকারিয়াস্যাপাডিয়া। ইংরেজিতে লটকনকে বলা হয় বার্মিজ গ্রেপ। বাংলাদেশে লটকন এলাকাভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন হাড় ফাটা, ভুবি, কানাইজু, লটকা, লটকাউ, লোটকা ইত্যাদি। নরসিংদীতে সবচেয়ে বেশি লটকনের উৎপাদন হয়।

এ বছর জেলার নয় উপজেলা মিলিয়ে প্রায় ৮৫০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল হয় যার অর্ধেকের বেশি বিজয়নগর উপজেলাতেই। ১০ কোটি টাকার বেশি কাঁঠাল বিক্রি হবে এ উপজেলাতে। এ বছর এখানে উৎপাদিত লিচু ১৫ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়। মোট ৪১৪ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়।

মৌসুমি ফল লিচু, কাঁঠাল, আম কেনার জন্য উপজেলার আউলিয়া বাজারে ছুটে আসেন আশেপাশের একাধিক জেলার ক্রেতারা। প্রায় দুই সপ্তাহের জন্য আউলিয়া বাজার ভোর থেকে বেলা ৮টা-৯টা পর্যন্ত লিচুর ক্রেতা-বিক্রেতায় সরগরম থাকে।

বিজয়নগরের কিছু অংশ পাহাড়ি এলাকা। এমন একটি এলাকার নাম পাহাড়পুর। উপজেলার ১৮ হেক্টর জমির লটকনের মধ্যে পাহাড়পুরেই প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হয়েছে। আখাউড়ার বাইপাস সড়ক হয়ে পাহাড়পুর যেতে বেগ পেতে হয় ভাঙাচোরা সড়কের কারণে। ওই ইউনিয়নসহ আশেপাশের এলাকাতে যাওয়ার সময় ফলের আবাদের ব্যাপকতা চোখে পড়ে। বিভিন্ন সড়কের দু’ধারে থাকা সারি সারি কাঁঠাল গাছের দৃশ্য যেন প্রকৃতিতে নতুন করে চেনায়। কেউ গাছ থেকে কাঁঠাল নামাচ্ছেন তো কেউ নামিয়ে স্তুপ করে রেখেছেন। পাইকারি ক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতাদরেকে পিকআপ ভ্যান ও রিকশাভ্যানে করে কাঁঠাল নিয়ে যেতে দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন বাগানে গেলে মাঝারি আকারের সবুজ রংয়ের মালটা চোখে পড়ে, যা আরো মাস দু’য়েক পর পরিপক্ক হবে।

একেবারে ভারত সীমান্ত ঘেঁষা বামুটিয়া গ্রামের লটকন চাষি তোফাজ্জল হোসেনে বাগানে যেতে মোটর সাইকেল রাখতে হয় কয়েকশ’ গজ দূরে। পাহাড়ি পথ হেঁটে তোফাজ্জেল হোসেনের বাহারি ফলের বাগান। মালটা, লটকন, কমলা, কয়েক জাতের আম ও লিচু, কাঁঠাল, লটকন, ড্রাগন, সৌদির খেজুর, পেঁপে- কী নেই তোফাজ্জল হোসেনের বাগানে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আম ‘মিয়াজাকি’ ধরে আছে তার বাগানে। মিয়াজাকি বাংলাদেশে ‘সূর্যডিম’ আম হিসেবে পরিচিত।

কথা হলে তোফাজ্জল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, লটকন চাষ খুব সহজ। অযত্ন-অবহেলাতেও লটকন গাছ বেড়ে উঠে। তবে লটকনের চারা লাগানোর সময় জায়গা বাছাই করতে হয় নিয়ম মেনে। পানি আটকায় না ও ছায়াযুক্ত এলাকা লটকনের জন্য উপযুক্ত।

সেজামুড়া গ্রামের চাষি আব্দুল হাসিম চাষি। সাত সকালে গিয়ে দেখা যায়, পানি চলাচল নির্বিঘ্ন করতে তিনি ড্রেন কাটছেন। নিজ বাড়ির ঠিক পাশেই আব্দুল হাসিমের লটকন বাগানে চোখজুড়ানো দৃশ্য। বেশ কয়েকটি গাছে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত লটকন ধরে আছে।

আব্দুল হাসিম বলেন, ১০০ গাছ আছে আমার বাগানে। এ পর্যন্ত ১৫-২০ হাজার টাকার লটকন বিক্রি করেছি। পাইকাররা এসে লটকন নিয়ে যায়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের পাইকাররা বাগানে আসেন লটকন নিতে। ‘ তিনি জানান, তার বাগানের কিছু লিচু গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। আগেই লিচু কিনে রাখা পাইকাররা ভালো ফলনের আশায় গাছে কেমিক্যাল দিলে লিচু গাছ মরে যায়। এখন ওই জায়গাতেও লটকন লাগানোর পরিকল্পনা করছেন।

কথা হয় পাহাড়পুর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলমের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, মাটির গুণের কারণে বিজয়নগরে সব ধরনের ফলের ভালো ফলন হয়। গত কয়েক বছর ধরে চাষিরা সুমিষ্ট ফল লটকনের প্রতি ঝুঁকেছেন। এবারও লটকনের ভালো ফলন হয়েছে। পাহাড়পুর ইউনিয়নেই ১০ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াইশ লটকনের চারা লাগানো যায়। একেকটি পূর্ণাঙ্গ গাছে ৮০ থেকে ১০০ কেজি লটকন পাওয়া যায়। কম যত্ন করেও ভালো ফলন বিধায় আমরা চাষিদেরকে লটকন চাষে আগ্রহ বাড়াতে কাজ করছি। প্রত্যকের বাড়ির অন্য গাছের ছায়ায় একটি করে হলেও লটকনের চারা লাগানোর জন্য পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।

আরেক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হাদিউল ইসলাম সৃজন বলেন, ফলের জন্য উর্বর ভূমি বিজয়নগর উপজেলা। দেশি, বিদেশি সব জাতের ফলই এখানে বাণিজ্যিভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে সাধ্যমত সব ধরনের সহযোগিতা করা হয় চাষিদেরকে।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট