• মঙ্গলবার   ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ||

  • মাঘ ১৮ ১৪২৯

  • || ০৯ রজব ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

বরেন্দ্র অঞ্চলে দার্জিলিং কমলা চাষে সাইদুলের অভাবনীয় সাফল্য

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ৬ ডিসেম্বর ২০২২  

সারি সারি কমলার গাছ। থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা সবুজ ও হলুদ রঙের কমলা। রসালো কমলার ভারে প্রতিটি গাছ নুয়ে পড়ছে। কোনো কোনো গাছে বাঁশের লাঠির সাহায্যে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। বাতাসে পাকা কমলার সুমিষ্ট গন্ধে পুরো বাগান ছড়িয়ে পড়েছে।

এমনি এক কমলার বাগানের দেখা মিলবে নওগাঁর সীমান্তবর্তী উপজেলা ধামইরহাটের আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের হয়রতপুর গ্রামের পাশে। বাগানের মালিক সাইদুল ইসলাম পরীক্ষামূলকভাবে দার্জিলিং জাতের এই কমলা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। চোখ জুড়ানো হলুদ কমলার সৌন্দর্যের সমারোহ দেখতে এসে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কমলা চাষে। চলতি ডিসেম্বর মাস থেকে এসব কমলা বাজারজাত করে লাভবান হওয়ার আশা করছেন তিনি। সাইদুল ইসলাম নওগাঁর সীমান্তবর্তী উপজেলা ধামইরহাটের আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা।

জানা যায়, সাইদুল ইসলাম ২০১২ সালে নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স শেষ করেন। এরপর তিনি চাকরির পিছনে না ছুটে নিজে কিছু করার চিন্তা করেন। এই ভাবনা থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের হয়রতপুর গ্রামের পাশে প্রথমে তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির ফল বাগান গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি দার্জিলিং জাতের কমলার চারা কিনে এনে এক বিঘা জমিতে রোপণ করেন। দীর্ঘ দুই বছরের পরিচর্যায় এ বছর প্রতিটি গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে কমলা এসেছে। এছাড়া সেই বাগানে রোপণ করেন বারি-১ মাল্টা, বারি-৩ বারোমাসি জাতের মাল্টা, বরই, পেয়ারা, কাটিমন, আমরুপালি, বারি-৪ জাতের আমের চারা।

ইতোমধ্যে মাল্টা, বরই ও পেয়ারা থেকেও ফলন পেয়েছেন তিনি। তার মিশ্র ফলের বাগানে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে ৮-১০ জন কৃষকের। বর্তমানে তার মিশ্র ফল বাগানের আয়তন ১৮ বিঘা। এ ব্যাপারে সাইদুল ইসলাম বলেন- মাস্টার্স শেষ করে চাকরির পিছনে না ছুটে বা অন্যের অধিনে না থেকে নিজে কিছু করার ভাবনা থেকেই মিশ্র ফল বাগান তৈরির চিন্তা করেন। প্রথমে তিন বিঘা জমি লিজ নিয়ে মাল্টা, বরই পেয়ারা এবং আমের চারা রোপণ করেন। তখন মাথায় আসে যেহেতু নওগাঁ আমের জন্য বিখ্যাত, আম ছাড়া অন্য কোনো ফসল ফালানো যায় কিনা। তখন পরীক্ষামূলক নীলফামারী থেকে দার্জিলিং জাতের কমলার চারা কিনে এনে এক বিঘা জমিতে রোপণ করেন।

তিনি আরো বলেন- মাল্টা, বরই, পেয়ারা ও আম পাশাপাশি কমলা চাষ করে সবচেয়ে কমলার ফলন ভালো হয়েছে। মাল্টা যেভাবে চাষ করা হয় সেভাবে কমলা চাষ করেছিলাম। অন্যান্য ফসলের চেয়ে রোগবালাই কম। প্রাকৃতিকভাবেই চাষ করা হচ্ছে। রোপণের পর এই প্রথম কমলার গাছে কমলা ধরেছে। প্রথমবারেই ফলন খুব ভালো হয়েছে।

বর্তমানে ১৩৪টি কমলার গাছ আছে। প্রতিটি গাছ থেকে সর্বচ্চো ৫০ কেজি করে কমলা পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন। চলতি ডিসেম্বর মাস থেকে এসব কমলা বাজারজাত করবেন বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। বাজারে কমলার দামও ভালো আছে। প্রথমবারেই ২-৩ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন। এছাড়াও বাগান থেকে আরো ৬ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন তিনি।
সাইদুল ইসলাম বলেন, এখন অনেকেই আমার এই কমলার বাগান দেখতে এসে কমলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এবং চারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কমলার ফলন ভালো হওযায় আরো বড় পরিসরে করার চিন্তাভাবনাও করছি।

কমলার বাগান দেখতে এসেছেন স্থানীয় রাকিবুল হোসেন বলেন, সাইদুলের বাগানে কমলা চাষের বিষয়টি বেশ কিছুদিন থেকে শুনছিলাম। মূলত দেখার জন্য এসেছি। বাগানে বিভিন্ন রকম ফলের গাছ দেখলাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে কমলা। এত বেশি পরিমাণ ধরে আছে দেখতে খুবই ভালো লাগছে। এই ধরনের মাটিতে এত সুন্দর কমলা হবে, আসলে কল্পনার বাইরে। এই ধরনের কমলার চাষ করতে পারলে লাভবান হওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে ধামইরহাট উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে লেবু জাতীয় ফসলের স¤প্রসারিত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ফল বাগান প্রদর্শনীর তিন বিঘা জমি সাইদুল ইসলামকে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে মাল্টা ও কমলা চাষের জন্য তা বৃদ্ধি করা হয়। এই অঞ্চল উচ্চ বরেন্দ্র-ভূমি শ্রেণির মধ্যে পড়েছে। এই জমি সমতল জমির চেয়ে উঁচু। বর্তমানে এ জমিগুলো কমলা চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। কমলা চাষের জন্য যে ধরনের মাটি বৈশিষ্ট্য থাকার দরকার এই অঞ্চলে রয়েছে। তার বাগানের কমলা গাছের বয়স ২ বছর। এবারই প্রথম ফলন এসেছে। আশা করছি আগামী বছর এই ফলন অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে।

তিনি আরো বলেন, কৃষি বিভাগ সব সময় বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। কেউ এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে চাইলে কৃষি বিভাগ তাদের স্বাগত জানায়। সেসব প্রশিক্ষণে ভূমি শ্রেণি অনুযায়ী কোন ফসল কোন জমিতে ভালো হবে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যেসব উদ্যোক্তা ও বেকার যুবকরা কৃষিতে আসতে চায় তাদের নিজ নিজ উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে সে কি ফসল করতে চায় সেটার উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ শুরু করলে আগামীতে কৃষি বিপ্লব ঘটবে।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট