• বুধবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪২৯

  • || ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

নকশিকাঁথা তৈরি করে স্বাবলম্বী ক্ষেতলালের ১০ গ্রামের শতাধিক নারী

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২  

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার ১০ গ্রামের শতাধিক নারীর হাতে তৈরি হচ্ছে বাহারি সব নকশিকাঁথা। তাদের উৎপাদিত এসব পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে বিদেশেও। ইতোমধ্যে অনেক নারীই এর মাধ্যমে হয়েছেন স্বাবলম্বী। আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে গ্রামীণ নারীদের এই চেষ্টাকে ব্যাণিজ্যিক রূপ দিতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহবান জানান নকশিকাঁথা কারিগররা। আর লোক গবেষকদের দাবি এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পটি রক্ষায় সরকারি যুগোপযোগী উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ।

ময়মনসিংহ গীতিকায় কবি চন্দ্রাবতীর রামায়ণ কাব্যে সীতার গুণের কথা বলতে গিয়ে নকশিকাঁথার প্রসঙ্গটিও বেশ সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়-

“সীতার গুণের কথা

কী কহিব আর,

কন্থায় আঁকিল কন্যা

চান, সুরুজ, পাহাড়।”

সেই আদিকাল থেকে নকশিকাঁথা বাঙালির ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের অন্যতম উপকরণ হয়ে আছে। গ্রামীণ জনপদ ছাড়িয়ে নকশিকাঁথার কদর এখন বিদেশেও।

২০০১ সালের দিকে স্বদেশপ্রীতির উদ্যোক্তা জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুর গ্রামের গৃহবধূ জোবেদা আক্তার স্থানীয় নারীদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে ৩০-৩৫ জন নারীকে নিয়ে আলমপুর জাগরণী মহিলা সমবায় সমিতি নামে নারীদের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। পরে এই সমিতির নারীদের হস্তশিল্প, ব্লক-বাটিকসহ নকশিকাঁথা সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে নকশিকাঁথা তৈরির কর্মযজ্ঞ আলমপুর থেকে আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামে ছড়িয়ে পরে। এখন প্রতি মাসে গড়ে ৭০-৮০টি কাঁথা তৈরি হচ্ছে এই এলাকায়। প্রথমে এসব পণ্য কৃষিমেলা, হস্তশিল্প মেলা, বস্ত্রমেলাসহ বিভিন্ন মেলার স্টলে বিক্রি করা হতো। তবে এখন বগুড়া, জয়পুরহাট ও ঢাকার বিভিন্ন শোরুম মালিক ছাড়াও বিদেশে হস্তপণ্য রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসব ‘নকশিকাঁথা’ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে।

১০ গ্রামের শতাধিক নারী পেয়েছেন নতুন আলোর দিশা। ঘরে ঘরে নারীরা এখন সুই-সুতা হাতে নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কাজেই ব্যস্ত। এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে এখানকার নারীরা পেয়েছেন সাংসারিক স্বচ্ছলতা। আর্থিক সহযোগিতা পেলে এর আরো প্রসার ঘটবে এমন দাবি এর সাথে জড়িত আত্মপ্রত্যয়ী নারীদের।

স্বদেশপ্রীতির উদ্যোক্তা ও আলমপুর গ্রামের গৃহবধূ জোবেদা আক্তার বলেন, স্থানীয় নারীদের সঙ্গে যোগাসূত্র স্থাপন ও নকশিকাঁথা বিপণনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে ক্ষেতলাল উপজেলায় ২০০১ সালের দিকে নারীদের উন্নয়নে ৩০-৩৫ জন নারীকে নিয়ে আলমপুর জাগরণী মহিলা সমবায় সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি এবং তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কারিগর তৈরি করে শুরু করি নকশিকাঁথা তৈরির কাজ। একটি কাঁথা তৈরিতে এক মাস থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় লাগে। আর তা বিক্রি করে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। প্রথম দিকে আমি নিজেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে নকশিকাঁথা সংগ্রহ করে তা কৃষিমেলা, হস্তশিল্প মেলাসহ বিভিন্ন মেলায় স্টলের মাধ্যমে এবং পাইকারি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতাম। এখন দেশের বিভিন্ন শোরুম মালিক ছাড়াও বিদেশে হস্তপণ্য রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসব ‘নকশিকাঁথা’ সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। বেড়েছে চাহিদাও। এতে করে এই জনপদের পিছিয়ে পরা নারীরা এখন নকশিকাঁথা তৈরি করে বেশ স্বচ্ছল জীবন-যাপন করছেন।

নারী কারিগরেরা জানান, তাদের তৈরি এসব নকশিকাঁথার নকশার ওপর নানা নামকরণ করা হয়। এরমধ্যে গোলাপকাঁথা, ময়ূরপাখা কাঁথা, বলকাঁথা, গুজরাটি কাঁথা, প্রিন্ট কাঁথা, পুঁটি মাছের ঝাঁক কাঁথা, মৌমাছির চাক কাঁথা, সুজনী কাঁথা, পাটি কাঁথা উল্লেখযোগ্য। আবার এসব নকশিকাঁথা সেলাইয়েরও রকমফের রয়েছে। রান ফোঁড়, ডবল রান ফোঁড়, ডারনিং ফোঁড়, বেঁকি ফোঁড়, বখেয়া ফোঁড়, বোতামঘর ফোড়, চেইন ফোঁড়, পখুরি, তারা ফোঁড় ইত্যাদি ফোঁড় বা সেলাইয়ে নকশিকাঁথা বোনা হয়।

বানাইচ গ্রামের নকশিকাঁথা কারিগর নাদিয়া আকতার বলেন, হাট-বাজারের তাঁতিদের কাছ থেকে রঙিন কাপড় এবং লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি, হলুদ প্রভৃতি রঙিন সুতা কিনে এনে কয়েকজন একসঙ্গে বসে গল্পে গল্পে নকশিকাঁথার কাজ করি। অনুপম দক্ষতায় কাঁথার জমিনে ফুটিয়ে তুলি নানান কারুকাজ। কোনো সময় কাঁথায় উঠে আসে দুঃখ-সুখের কাহিনিও।

তিনি আরো বলেন, তিন মাসে ৬টি নকশিকাঁথা সেলাই করেছি। এর মধ্যে গোলাপের ফুলতোলা একটি ‘গোলাপকাঁথা’ রয়েছে। এতে খরচ পড়েছে ৪ হাজার টাকার মতো। অন্যগুলো ‘গুজরাটি কাঁথা’, ‘পার্টি কাঁথা’ ও ‘বিস্কুটকাঁথা’। এসব কাঁথাতে খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকার মতো। পাইকারি পর্যায়ে একেকটি ‘গোলাপকাঁথা’ কাজভেদে বিক্রি হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। অন্যগুলো বিক্রি হয় সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।

ঢাকা থেকে আসা মাহিয়া মিম, নওগাঁর জেসমিন নাহার, ও দিনাজপুরের সম্পা সামান্তা জানান, বিভিন্ন ডিজাইনে তৈরি করা নকশিকাঁথা এখানে পাওয়া যায় এমনটা জেনেই এখানে এসেছেন তারা। কিন্তু এখানে এসে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছেন এনং তারা সবাই সাধ্যের মধ্যে একটি করে পছন্দের নকশিকাঁথা কিনেছেন বলেও জানান তারা।

লোক গবেষক মো. আব্দুল মজিদ বলেন, আদিকাল থেকে নকশিকাঁথা বাঙালির ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের অন্যতম উপকরণ। যা এখন বিলুপ্তপ্রায়। এমন ক্রান্তিলগ্নে স্বদেশপ্রীতির উদ্যোক্তা ও আলমপুর গ্রামের গৃহবধূ জোবেদা আক্তারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই শিল্পটি রক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ জরুরি।

জয়পুরহাট জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সাবিনা সুলতানা বলেন, ক্ষেতলাল উপজেলার আলমপুরসহ আশপাশের কয়েক গ্রামের নারীরা নকশিকাঁথা সেলাই করে নিজেরাই স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টাকে স্বাগত জানাই। এই নারীদেরকে যদি আমরা মহিলা বিষয়ক অধিদফতর থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ করতে পারি এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারি তাহলে তাদের আয় আরও বেড়ে যাবে, সংসারের আরও উন্নতি ঘটবে এবং তাদের সাফল্য আসবে।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট