• বুধবার   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪২৯

  • || ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

উদ্যোক্তা বিথীর ঘানি ভাঙা বাদাম তেল সাড়া ফেলেছে

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২  

একসময় গরু দিয়ে কাঠের তৈরি ঘানিতে ভাঙানো হতো সরিষা। আর এই ঘানির ভাঙানো সরিষার তেল দিয়েই মিটতো সংসারের তেলের চাহিদা। বর্তমানে এই ঘানি বিলুপ্তপ্রায়। তাই শতভাগ খাঁটি তেল পাওয়া এখন শুধু মুশকিলই নয়, দুষ্করও বটে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে বৈদ্যুতিক মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে কাঠের ঘানি তৈরি করেও যে তেল উৎপাদন করা যায়, তা নতুন করে প্রমাণ করেছেন জয়পুরহাটের নারী উদ্যোক্তা বিথী পারভীন।

বিথী পারভিন জয়পুরহাট সদর উপজেলার দক্ষিণ রাঘবপুর গ্রামের ওয়ালীউল হাসান রিপনের স্ত্রী। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জননী। ২০১৯ সালে জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর-বিথী গৃহিণী হিসেবে বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু তিনি স্থির থাকতে পারছিলেন না। কিছু একটা করা দরকার এই চিন্তাই তার মাথাতে ঘুরপাক খেতে থাকে। হঠাৎ একদিন কাঠের ঘানিতে বাদাম তেল তৈরির কথা মাথায় আসে তার। বিষয়টি নিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে শুরু করেন কাঠের ঘানিতে বাদাম তেল উৎপাদন। গরুর পরিবর্তে এই ঘানিতে বৈদ্যুতিক মেশিন প্রতিস্থাপন করেন তিনি । এক কেজি বাদাম বা সরিষা থেকে ২৫০ গ্রাম তেল উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিদিন ১০ কেজি পর্যন্ত বাদাম ভাঙানো হয় এখানে। বিথি এ প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘জয়পুরী অর্গানিক ফুড’। এখানে শুধু বাদাম তেলই নয়, সরিষা, কালোজিরা ও সূর্যমুখী তেল উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে তার।

উদ্যোক্তা বিথী পারভীন বলেন, হঠাৎ মাথায় আসে বাদামের তেল প্রক্রিয়াজাতের কথা। এটা এখন বাজারে পাওয়া যায় না। তাও আবার ঘানিতে ভাঙানো। এরপর বিষয়টি আমার স্বামীকে জানালাম, সেও আগ্রহী হলো। আমরা কাঠের ঘানি করলাম এবং তেল ভাঙা শুরু করলাম। এখন আশপাশের এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের ভালো সাড়া পাচ্ছি।

বিথীর স্বামী ওয়ালীউল হাসান রিপন বলেন, স্ত্রীর কথায় আমি বিভিন্নজনের সঙ্গে পরামর্শ করি। এরপর কাঠের ঘানিতে বাদাম তেল করা যায় কি না, তা নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখি। পরে কাঠের ঘানি প্রস্তুত করে বাদাম তেল তৈরি শুরু করি। এ তেল কোল্ড প্রেস অর্থাৎ মেশিনে ভাঙা তেলের মতো, গরম হবে না। তাই এই তেলের গুণাগুণ অক্ষুণ্ন থাকে।

তিনি আরও বলেন, বাদাম তেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই রান্না, ত্বকের পরিচর্যা, চুলে দেওয়া, বাচ্চাদের বিভিন্ন খাবার তৈরির জন্য এই তেল কিনছেন। এই তেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বর্তমান প্রতি লিটার বাদাম তেল ৮৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একদম নির্ভেজাল ও খাঁটি তেল গ্রাহকদের সরবরাহের জন্য চেষ্টা করছি আমরা।

পরিবারের সদস্যদের জন্য বাদাম তেল কিনতে আসা জয়পুরহাট শহরের হাসিবুল হাসান বলেন, আমি জেনেছি বাদাম তেল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। কিন্তু আমি এই তেল খুঁজে পাইনি কোথাও। পরে শুনলাম নারী উদ্যোক্তা বিথী এ নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং বাদাম তেল সংগ্রহ করি। আগেও নিয়েছি কিন্তু তা শেষ হওয়ায় আবার নিতে এসেছি। এই তেল খাওয়া ও শরীরে ব্যবহারের প্রতিক্রিয়াও ভালো।

নিয়মিত বাদাম তেল ক্রেতা জয়পুরহাটের খঞ্জনপুর এলাকার নুরুজ্জামান বাবু বলেন, আমরা কাঠের ঘানিতে ভাঙা কোল্ড প্রেস বাদাম তেল পাচ্ছি। এই তেল স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। ব্লাড পেসার ও ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এ তেল খুব উপকারী। আমরাও এটা ব্যবহার করছি এবং প্রতিবেশী-স্বজনদেরও ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করছি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি ঘানি ভাঙা তেল অন্য কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য এর দাম বেশি হলেও আমরা কিনছি।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জেলা কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, কাঠের ঘানিতে তেল ভাঙা একটি হারানো ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনেছেন বিথী পারভিন। তিনি কাঠের ঘানিতে বাদাম থেকে তেল তৈরি করছেন। বাদাম তেলে সরিষা ও সয়াবিনের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। এ ছাড়া এই তেলে রয়েছে প্রোটিন, যেটা আমাদের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোক্তার যদি পণ্য বিপণনে কোনো সহযোগিতা লাগে, সে ক্ষেত্রে আমরা মেলাসহ অনলাইন গ্রুপ, ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা করে দেব। সেই সঙ্গে বিএসটিআইয়ে নিবন্ধন করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এছাড়া তার আর্থিক কোনো সহযোগিতা বা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলেও আমরা তাকে সহযোগিতা করবো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ জাহানারা আক্তার সুমি বলেন, বাদাম হলো প্রাকৃতিক উদ্ভিদজাত খাদ্য উপাদান। এটি শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। যেমন বাদামে যে প্রোটিন রয়েছে তা অন্যান্য খাদ্য উপাদান থেকে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি এবং উন্নত মানের। ১০০ গ্রাম মিক্সড বাদাম থেকে প্রায় ২০ গ্রাম প্রোটিন আমরা পেতে পারি। বাদামের তেলে যেহেতু বাদাম ব্যবহার করা হয় তাই বাদাম তেলে এসব পুষ্টিগুণ পাওয়া যাবে। বাদাম তেলে যে প্রোটিন রয়েছে তা আমাদের শরীরের মাংস পেশীর গঠন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। বাদাম তেলে যে ফ্যাট রয়েছে তা উপকারী ফ্যাট। সাধারণত খাদ্য থেকে আমরা যে ফ্যাট পাই তা দুই ধরনের। স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট। লাল মাংস বা অন্যান্য তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে কিন্তু বাদামে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যেমন মুফা (মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড) এবং পুফা (পলি মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড) বেশি থাকে। যা আমাদের রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ট্রাইগ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং শরীরের জন্য উপকারী এইচডিএল অর্থাৎ ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। যা করোনারি হার্ট ডিজিজ, ব্লাড প্রেসার কন্ট্রোল সাহায্য করে থাকে। বাদাম তেলে বিভিন্ন রকম ভিটামিন এবং খনিজ লবণ রয়েছে যেমন ভিটামিন ই, ভিটামিন বি ইত্যাদি। এই ভিটামিনগুলো আমাদের ত্বক, চুল এবং আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোর সুস্থতার জন্য প্রয়োজন।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যবিজ্ঞান ও পুষ্টি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. এন এইচ এম রুবেল মজুমদার বলেন, সয়াবিন তেলের বিকল্প হতে পারে বাদামের তেল। তবে দাম বেশ চড়া। বাদাম তেলের রয়েছে বেশ গুণাগুণ। আমাদেশ দেশে সরিষা বা সয়াবিনের পরই দেখা যাচ্ছে গৃহস্থালিভাবে এই বাদাম তেল উৎপাদন করা হয়। এর উৎপাদনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে প্রাচীনতম একটি পদ্ধতি হলো ঘানি । এই প্রক্রিয়ায় বাদাম তেল ভাঙলে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা ৬০ ডিগ্রির ওপরে না ওঠে অর্থাৎ ইংরেজিতে একে কোল্ড প্রেস বলা হয়। যেহেতু বাদাম প্রাকৃতিক উদ্ভিদজাত উপাদান থেকে আসে, এ জন্য এতে কোলেস্টেরল থাকে না। আমরা প্রাণিজ উৎস থেকে যেসব তেল পাই, সেখানে কোলেস্টেলের পরিমাণ বেশি থাকে। এই বাদাম তেলে অন্যতম ভিটামিন ‘ই’ থাকে। এই ভিটামিন ‘ই’ শরীরের বিভিন্ন ধরনের ত্বক, চুল এবং আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোর সুস্থতার জন্য কাজ করে। বাদাম তেলে কারসোনচারিক উপাদান কম থাকায় কানসার হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায় এবং অন্যান্য ইনফ্লোমন্টারি ডিজিজগুলো কম থাকে। বাদাম তেলের ব্যবহারটা আমরা গৃহস্থালিতে রান্নার কাজে বিশেষ করে ভাজা, খাদ্য প্রস্তুতিতে, পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল চিপস ভাজা অথবা বেকারি পণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করতে পারি।

এত সব গুণাগুণের বিপরীতে বাদাম তেলের কিছু অপকারিতার কথাও জানালেন ড. রুবেল মজুমদার। তিনি বলেন, আমরা বাদাম তেল দিয়ে রান্নার ক্ষেত্রে যদি বেশি তাপমাত্রা ব্যবহার করি, তাহলে তেল অক্সিডাইজড হয়ে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হবে। আমরা উৎপাদন পর্যায়ে যখন জমি থেকে বাদাম নিয়ে আসি, তখন পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পানি বা আর্দ্রতার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মোল্ড জন্মাবে। ফলে আফলাটক্সিন তৈরি হবে। যেহেতু গৃহস্থালিতে রিফাইং প্রসেস কাজ করে না, সেহেতু আফলাটক্সিন থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট