সোমবার   ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ || ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ০৫:৫২, ১১ মার্চ ২০২৩

জয়পুরহাটের যেসব দোকানে কেনা যাবে দেড় শ গ্রাম মাংসও

জয়পুরহাটের যেসব দোকানে কেনা যাবে দেড় শ গ্রাম মাংসও

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার ফুলদীঘি বাজারে মুরগির মাংস কিনতে গেছেন রেজাউল করিম। তাঁর বাড়ি ফুলদীঘি বাজার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে পাঁচুইল গ্রামে। দিনমজুর রেজাউলের বাড়ির কাছাকাছি মাংস কেনার একাধিক দোকান আছে। তারপরও এতটা পথ হেঁটে এই ফুলদীঘিতে যাওয়ার কারণ হলো, এই দোকান থেকে তিনি চাইলে কয়েক টুকরা মাংস বা সর্বনিম্ন ১৫০ গ্রাম মাংসও কিনতে পারবেন। এমন দোকান এ তল্লাটে আর নেই।

রেজাউল বলছিলেন, ‘গোটা মুরগি কেনার সামর্থ্য হামার নাই। কুনো বড় দোকানোত গ্যালে দ্যাড় শ গ্রাম মাংস চ্যালে তো বেচপি ন্যা। তাই এটি আচ্ছি।’ রেজাউল আধা কেজি মুরগির মাংস কিনলেন। তবে জানালেন, কোনো কোনো দিন এর চেয়েও কম মাংস কেনেন। এই দোকানের নিয়ম হলো, ন্যূনতম ১৫০ গ্রাম মাংস এখানে বিক্রি হয়।

রেজাউলের মতো অনেক নিম্নবিত্ত মানুষের সাধ মেটাচ্ছে এসব দোকান। শুধু ক্ষেতলালে নয়, দেশের সাত জায়গায় দোকানগুলো তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ ধরনের দোকানগুলোর নাম ‘প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র’। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মুরগিসহ সব ধরনের মাংসের দাম নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে। তাই এসব দোকানে ভিড় বাড়ছে প্রতিদিন। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এমন দোকানের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি এই কঠিন সময়ে মাছ, গরুর মাংসসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা থাকলে ভালো।

প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র সমাচার

নিম্নবিত্তের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে স্বল্প পরিমাণের মাংসের এসব দোকান শুরু হয়েছে প্রায় পাঁচ বছর আগে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসেএফ) সহায়তায় তাদের সহযোগী বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন এসব দোকান পরিচালনা করছে। ওই সব সহযোগী সংগঠনের যাঁরা উপকারভোগী সদস্য আছেন, তাঁরাই ঋণ নিয়ে মুরগি ও হাঁস পালন করেন এবং তা বিক্রি করেন। তবে শর্ত একটাই, স্বল্প পরিমাণে মাংস বিক্রি করতে হবে।

ফুলদীঘি বাজারের দোকানটির মালিক সামছুদ্দিন সরদার। তিনি বেসরকারি সংগঠন এহেড সোশ্যাল অর্গানাইজেশনের (এসো) সহায়তায় এ দোকান করেছেন। সামছুদ্দিন সরদার জানালেন, এখন প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন ক্রেতা দোকানে আসেন। সপ্তাহের দুই হাটের দিন বৃহস্পতি ও রোববার ক্রেতার সংখ্যা দ্বিগুণ, কখনো তিন গুণ হয়।

সামছুদ্দিন বলছিলেন, ‘গরিবের ভালো হছে। চাহিদামতো মুরিগর মাংস কিনব্যার পারে। দুটো মাংস প্যাটোত যায়।’

পিকেএসএফের হয়ে এই কাজের তত্ত্বাবধান করেন প্রকল্প পরিচালক শরীফ আহম্মদ চৌধূরী। তিনি বলছিলেন, স্বল্প পরিমাণে মাংস বিক্রির পেছনে দুটো উদ্দেশ্য আছে। এক, দরিদ্র মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ। দুই, মাঠপর্যায়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টি। এখানে রেজাউলের মতো অনেক মানুষ আমিষের সুবিধা পাচ্ছেন। আবার সামছুদ্দিনের মতো উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।

উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বিক্রয়কেন্দ্র

পিকেএসএফের একটি বড় কাজ ক্ষুদ্রঋণ দান। মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঋণ দেওয়ার কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রযুক্তি-সহায়তাও দেয় তারা। ‘প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র’ প্রকল্পে পেকিন জাতের হাঁস পালন, নিরাপদ মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রয়লার, সোনালি মুরগি পালন, ডিম উৎপাদনের জন্য লেয়ার জাতের মুরগি পালনে সহায়তা দেওয়া হয়। শুধু অর্থ নয়, এসব পালনে কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হয় সদস্য পর্যায়ে। তাদের উৎপাদিত এসব প্রাণিজ পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতেও দেওয়া হয় সহযোগিতা।

জয়পুরহাটের ‘এসো’ ছাড়া আরও ছয় সংগঠনের মাধ্যমে এখন উদ্যোক্তা সৃষ্টিও প্রাণিসম্পদ বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করছে। সেগুলো হলো দিনাজপুররে গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র, জয়পুরহাট সদরের জাকস ফাউন্ডেশন, দিনাজপুরের মহিলা বহুমুখী শিক্ষাকেন্দ্র, খুলনার নবোলক পরিষদ, রাজশাহীর মোহনপুরের শতফুল বাংলাদেশ এবং শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস)।

দরিদ্র মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব মাংসের দোকানের উদ্যোক্তারাও নিজেদের হাল ফেরাচ্ছেন। খুলনার বটিয়াঘাটার জলমা ইউনিয়নের ঘোলা গ্রামের বাসিন্দা মো. মুসা খাঁ। তিনি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নবলোক পরিষদের সদস্য হিসেবে সেখানে কৈয়া বাজারে প্রাণিসম্পদ বিক্রয়কেন্দ্রের উদ্যোক্তা হয়েছেন। মুসা জানান, ১৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তবে এই ব্যবসায় তাঁর হাল ফিরেছে। এখন প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা আয় হয়।

প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয়। এ জন্য উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে।

নবলোক পরিষদের কর্মসূচি সমন্বয়কারী মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, ‘হাতে গ্লাভস না পরে মাংস কাটার নিয়ম নেই। মাংস কেটে তা কাচের গ্লাসের মধ্যে রাখতে হয়। যাতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।’

এ সময়ের বন্ধু

কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়তে বাড়তে প্রতি কেজি ২২৫ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ১০০ টাকার মতো বেড়েছে। এ সময়ে প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্রগুলো দরিদ্র মানুষের বন্ধুর মতো কাজ করছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক রায়হান হাবিব। তিনি বলছিলেন, ‘গরিব মানুষ অনেক সময় নিজে না খেয়ে অন্তত সন্তানের জন্য হলেও মাংস কিনতে চায়। এ জন্য তাদের অল্প মাংস হলেও চলে। এসব দোকান সেই প্রয়োজন মেটাবে। এমন দোকান দেশের প্রতিটি অঞ্চলে হওয়া উচিত।’

এখন অন্তত আরও ১৩টি প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার কাজ চলছে বলে জানান পিকেএসএফের ব্যবস্থাপক (সমন্বিত কৃষি) শাহরিয়ার হায়দার।

করোনাকালে দেশে অন্তত ২০ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন বলে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে দুর্দশায় পড়েছেন স্বল্প আয়ের এসব মানুষ।

মাংসের মতো পচনশীল দ্রব্য সংরক্ষণ করার বা বেশি করে কেনার সামর্থ্য যেসব মানুষের নেই, তাঁদের জন্য প্রাণিসম্পদ পণ্য বিক্রয়কেন্দ্রের উদ্যোগ যথেষ্ট ইতিবাচক বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রচলিত বাজারজাতকরণের মডেলের বাইরে এটা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

প্রয়োজনীয় পণ্যের মিনিপ্যাক সংস্কৃতি ভালো সাড়া পাওয়ার কথা। এটা বিক্রেতা বা উদ্যোক্তার জন্য সহায়ক। আবার এসব দোকানের ক্রেতা যাঁরা নিম্নআয়ের মানুষ, তাঁদের জন্যও সাশ্রয়ী।

গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এ সময়ে মাছ, মসলা বা ডালসহ নানা প্রয়োজনীয় দ্রব্যেরও এমন বাজার থাকা দরকার।

জাগ্রত জয়পুরহাট

সর্বশেষ

জনপ্রিয়