মঙ্গলবার   ০৫ মার্চ ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

প্রকাশিত: ১৮:১১, ৬ ডিসেম্বর ২০২৩

ঘুরে আসুন সেরা ৫ পর্যটনস্থল

ঘুরে আসুন সেরা ৫ পর্যটনস্থল
সংগৃহীত

লালন শাহের আখড়া আর কবিগুরুর কুঠিবাড়ি দেখার জন্য অনেকেই ছুটে যান কুষ্টিয়ায়। জায়গাটা বড় মায়াবী; কাব্যিক হতে বাধ্য করে। এখানে পাহাড় বা সাগর নেই, কিন্তু নদী আছে। নাম তার গড়াই। মধ্যরাতে নৌকার গলুইয়ে শুয়ে হিমেল রাতে ভরা পূর্ণিমায় জোছনা দেখার ইচ্ছা পূর্ণ করতে চলে যেতে পারেন কুষ্টিয়ায়।

ফ্যাশনের ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য রইল এই শীত শীত আবহাওয়ায় কুষ্টিয়ায় ভ্রমণের সেরা পাঁচটি স্থানের সন্ধান।

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি ও জাদুঘর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি

কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে কুমারখালীতে শিলাইদহ গ্রাম। এই শিলাইদহ গ্রামেই অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ি। ১৮০৭ সালে রামলোচন ঠাকুরের উইল সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এ অঞ্চলের জমিদারি পান। পরবর্তী সময় ১৮৮৯ সালে জমিদারি দেখাশোনার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে জমিদার হয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহের এই কুঠিবাড়ি থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত জমিদারি পরিচালনা করেন। কবি এখানেই ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদ শুরু করেন। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ৩০ বিঘা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এখানে রয়েছে বাগান ও দুটি পুকুর। ভবনটির প্রবেশমুখে যে তোরণ রয়েছে, তা দেখলে ভবনটির নির্মাণশৈলী যে কারও নজর কাড়বে। ভবনটিতে রয়েছে বিভিন্ন আকারের ১৬টি কক্ষ। দোতলার ওপরের পিরামিড আকৃতির ছাদ এর সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়েছে। ১৯৫৮ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িটি সংরক্ষণ করছে। এখানে তাঁর স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

 

ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত

 

ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত

 

ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথের নানা বয়সের ছবি। তা ছাড়া এখানে রয়েছে তাঁর ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও বিভিন্ন শিল্পকর্ম। তাঁর ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে রয়েছে পালকি, কাঠের চেয়ার, টি-টেবিল, সোফাসেট, আরামকেদারা, পালঙ্ক, স্পিডবোটসহ অন্যান্য আসবাব। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ জাতীয় পর্যায়ে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী পালিত হয়।
গ্রীষ্মকালে এটি খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। আর শীতকালে খোলা হয় সকাল ৯টায় এবং বন্ধ হয় বিকেল ৫টায়। সাপ্তাহিক বন্ধ রোববার। প্রতিদিন বেলা একটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিরতি থাকে। প্রবেশমূল্য সাধারণভাবে ১৫ টাকা, শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ আর বিদেশি নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা।

২. লালনের আখড়া

ফকির লালন শাহের মাজার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অবস্থিত

 

ফকির লালন শাহের মাজার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অবস্থিত

 

আধ্যাত্মিক সংগীতজ্ঞ লালন শাহ বাংলা লোকসংগীতকে দিয়েছেন ভিন্নমাত্রা, যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ফকির লালন শাহের মাজার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অবস্থিত। লালন শাহ এই কুমারখালীর ছেঁউড়িয়াতে তাঁর শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি মহোৎসবের আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য একত্র হতেন এবং সংগীত আয়োজন হতো। লালন শাহের মৃত্যুর পর স্থানটিতেই সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিস্থলেই এক মিলনক্ষেত্র বা আখড়া গড়ে ওঠে। এ সমাধি ঘিরে রয়েছে তাঁর শিষ্যদের সারি সারি কবর। ফকির লালন শাহের শিষ্য আর দেশ-বিদেশের বাউলেরা এ আখড়ায় বিশেষ তিথিতে সমবেত হয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

লালন শাহ এই ছেঁউড়িয়াতে তাঁর শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন

 

লালন শাহ এই ছেঁউড়িয়াতে তাঁর শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন

 

প্রতিবছর দুবার লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। একবার দোল পূর্ণিমা উৎসবের সময় এবং আরেকবার বাংলা কার্তিক মাসের ১ তারিখ লালন আখড়ায় বিশাল লালন মেলা হয়। লালন মেলায় সারা দেশ থেকে তাঁর শিষ্যদের আগমন ঘটে। রাতভর চলে বাউল গানের উৎসব। এ উপলক্ষে মাজারকে সাজানো হয় রঙিন করে। আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ ও বিশাল শামিয়ানা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে থাকে গ্রামীণ মেলার আয়োজন। লালন মেলা উপলক্ষে দেশ-বিদেশের অনেক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে।

৩. রেইনউইক বাঁধ

রেইনউইক বাঁধ কুষ্টিয়া শহরের ভেতরে অবস্থিত। এটি গড়াই নদীর পাড়ে শহর রক্ষা বাঁধ

রেইনউইক বাঁধ কুষ্টিয়া শহরের ভেতরে অবস্থিত। এটি গড়াই নদীর পাড়ে শহর রক্ষা বাঁধ

রেইনউইক বাঁধ কুষ্টিয়া শহরের ভেতরে অবস্থিত। এটি গড়াই নদীর পাড়ে শহর রক্ষা বাঁধ। রিকশাযোগে যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ১০ মিনিট। ডব্লিউ বি রেইনউইক নামের জনৈক স্কটিশ ভদ্রলোক রাজশাহী জেলার বাগাতিপাড়া থানার লক্ষণহাটি নামের স্থানে ১৮৮১ সালে মেসার্স রেইনউইক অ্যান্ড কোম্পানি নামে ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানাটি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। চিনিকলের যাবতীয় খুচরা যন্ত্রাংশ, কৃষিযন্ত্র, আখমাড়াই কল ও তার যন্ত্রাংশ এই কারখানায় তৈরি করা হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার আর হাতে তৈরি যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারের উদ্দেশে রেইনউইক একই নামে কুষ্টিয়া জেলায় ১৯১৪ সালে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখন থেকেই কুষ্টিয়ার এই কারখানাকেই তাঁর কোম্পানির প্রধান অফিস এবং রাজশাহীর লক্ষণহাটি অফিসকে এর শাখা অফিস হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণ করা হয় এবং জাহাজ নির্মাণ সংস্থার অধীন ন্যস্ত করা হয়। ১৯৭৩ সালে কারখানাটি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার অধীন নেওয়া হয়।

নদীর তীরবর্তী বাঁধ এবং এর সঙ্গেই মিলে পতিত জমিতে লাগানো মনোরম গাছে শোভিত জায়গাটি কুষ্টিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান

নদীর তীরবর্তী বাঁধ এবং এর সঙ্গেই মিলে পতিত জমিতে লাগানো মনোরম গাছে শোভিত জায়গাটি কুষ্টিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান

এই মিলের উত্তর দিকসংলগ্ন গড়াই নদী। নদীর তীরবর্তী বাঁধ এবং এর সঙ্গেই মিলে পতিত জমিতে লাগানো মনোরম গাছে শোভিত জায়গাটি কুষ্টিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন। নদীর তীরে স্থানটি শহরের মানুষের কাছে অবসরযাপনের জন্য জনপ্রিয়। স্থানটির একটি বিশেষত্ব, এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুই-ই দেখা যায়। বাঁধটি ‘রেইনউইক বাঁধ’ নামে পরিচিত।

৪. হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত। এই সেতুর নির্মাণকাল ১৯০৯ থেকে ১৯১৫। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামানুসারে এর নাম। এর দৈর্ঘ্য ১৭৯৮ দশমিক ৩২ মিটার বা ৫ হাজার ৯০০ ফুট। এর ওপর দুটি ব্রডগেজ রেললাইন রয়েছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের একটি স্প্যান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ভেড়ামারা বা উত্তরবঙ্গ অভিমুখী বাসে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে পৌঁছানো যায়। পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।

৫. টেগর লজ

কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় কবি আজিজুর রহমান সড়কে অবস্থিত টেগর লজ

কবির স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সবার কাছে পরিচিত হলেও তাঁর স্মৃতিধন্য টেগর লজ এখনো রয়েছে অনেকের কাছেই অজানা। কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় কবি আজিজুর রহমান সড়কে অবস্থিত টেগর লজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণের পর শিলাইদহে আসেন ১৮৯২ সালে। সে সময়েই ঠাকুর এস্টেটের জমিদারি দেখাশোনার জন্য কুষ্টিয়া শহরে কবি আজিজুর রহমান সড়কসংলগ্ন মিলপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় টেগর অ্যান্ড কোম্পানি। আর টেগর অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবসায়িক অফিস ছিল টেগর লজ। ১৮৯৫ সালে টেগর অ্যান্ড কোম্পানির অফিস হিসেবে টেগর লজ ব্যবসায়িক কাজ শুরু করে। তখন এর সদর দপ্তর ছিল কলকাতায়। ৯ কাঠা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত টেগর লজের প্রবেশপথে কবিগুরুর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ভেতরে আছে সবুজ ঘাসে ঢাকা আঙিনা ও একটি ছোট মুক্তমঞ্চ। এই মুক্তমঞ্চে রবীন্দ্রজয়ন্তীসহ বিভিন্ন উপলক্ষে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নিচতলায় একটি বড় হল ঘর আর ওপরের তলার তিনটি ঘরের একটিতে কবিগুরুর রচিত গ্রন্থমালা ও কবিগুরুর আঁকা ১২টি ছবি রাখা আছে। একতলা থেকে দোতলায় ওঠার জন্য পশ্চিম পাশের কুঠুরির কোণে আছে একটি সুদৃশ্য প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি। টেগর লজে কবি অসংখ্য কবিতা রচনা করেন, যা পরে ‘ক্ষণিকা’ এবং ‘কথা ও কাহিনী’তে প্রকাশিত হয়।

টেগর লজে কবি অসংখ্য কবিতা রচনা করেন, যা পরে ‘ক্ষণিকা’ এবং ‘কথা ও কাহিনী’তে প্রকাশিত হয়

ঢাকার কল্যাণপুর থেকে হানিফ বা শ্যামলী বাসে করে কুষ্টিয়া যাওয়া যায়। ভাড়া নন-এসি ৬০০ টাকা আর এসি ১০০০ টাকা।

ট্রেনে যেতে চাইলে সুন্দরবন এক্সপ্রেস অথবা চিত্রা এক্সপ্রেসে যেতে পারবেন। সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় আর চিত্রা এক্সপ্রেস সন্ধ্যায় কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। ট্রেনে গেলে আপনাকে পোড়াদহ বা ভেড়ামারা স্টেশনে নামতে হবে। ভেড়ামারা বা পোড়াদহ থেকে বাস বা সিএনজিতে কুষ্টিয়া শহরে যেতে পারবেন অটোরিকশা বা সিএনজিতে। যেসব খাবার না খেলে কুষ্টিয়া যাওয়া বৃথা, সেগুলো জানিয়ে দিই ঝটপট। জগদীশের দই আর রসগোল্লা, বিখ্যাত তিলের খাজা আর কুলফি এবং শহরের ভেতরে রেলগেটের পাশে গন্ধভাদাল পাতার বড়া বা পাকোড়া। শীত শীত আমেজে উত্তরবঙ্গ ঘোরার মজাই আলাদা। তাই দুটি দিন বের করে ঘুরে আসতে পারেন ভিন্টেজ আবহের কুষ্টিয়া শহরে।

সূত্র: প্রথম আলো

সর্বশেষ

জনপ্রিয়