• শুক্রবার   ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২৫ ১৪২৯

  • || ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাগ্রত জয়পুরহাট

আমলের উত্তম সময়, যখন আসমানের দরজা খুলে যায়

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২  

আকাশের দরজা একটি গায়েবি বিষয়। মুমিন বান্দা বিনাবাক্যে এর উপর দৃঢ়বিশ্বাস স্থাপন করেন। আকাশের উন্মুক্ত দরজা দিয়ে ধরার বুকে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। ফেরেশতাদের আসা-যাওয়া, তওবা গ্রহণ, মুমিন বান্দার নেক আমল এবং মৃত্যুর পর তার আত্মা ঊর্ধ্বে উত্তোলনসহ বিভিন্ন কারণে আল্লাহ আকাশের দরজাগুলো খুুলে দেন। দিন-রাতের বিশেষ সময়ে, সপ্তাহে বা নির্দিষ্ট মাসে এই দরগুলো খুলে দেওয়া হয় বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। 

আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দা যেকোনো সময় যেকোনো কিছু চাইতে পারে। আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (সুরা মুমিন: ৬০)। কিন্তু হাদিস অনুযায়ী, যখন আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়, তখন দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মুমিনের আমলসংক্রান্ত আসমানের দরজা খোলার বিশেষ সময়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো—

গভীর রজনী
গভীর রজনীতে আসমানের দরজা খুলে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে; আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। আমাদের রব ঘোষণা করতে থাকেন, ‘আমার কাছে প্রার্থনা করবে কে? আমি তার প্রার্থনা কবুল করব।’ এভাবেই ফজর পর্যন্ত আহ্বান করতে থাকেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ৩৮২১)

সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ার পর
রাসুলুল্লাহ (স.) দুপুরে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পর জোহরের ফরজ নামাজের আগে নিয়মিত চার রাকাত সুন্নত নামাজ পড়তেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এটি এমন সময়, যখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, আর এই সময়ে আমার একটি নেক আমল উত্থিত হোক তা আমি ভালবাসি।’ (তিরমিজি: ৪৭৮; ইবননেমাজাহ: ১১৫৭; মেশকাত: ১১৬৯)

আজানের সময়
যখন মুয়াজ্জিন আজান দেন, তখন বান্দার দোয়া কবুলের জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না। আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী কারিম (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আজান দেওয়া হয়, তখন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দোয়া কবুল করা হয়।’ (আহমদ: ১৪৭৩০; সহিহাহ: ১৪১৩; সহিহ আত-তারগিব: ২৬০)

ইকামত ও জিহাদের ময়দানে সারিবদ্ধ হওয়ার সময়
ইকামতকে হাদিসে দ্বিতীয় আজান বলা হয়েছে। যখন নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ তাআলা আকাশের দরজা খুলে দেন। জাবের (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন মানুষ নামাজের জন্য কাতারবদ্ধ হয় এবং জিহাদের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাড়াঁয়, তখন আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর আনতনয়না হূরদেরকে সাজিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা আত্মপ্রকাশ করে। যখন ব্যক্তিটি (নামাজে বা জিহাদে) উঁকি মারে, তখন হূরেরা তার জন্য দোয়া করে বলে, হে আল্লাহ! তাকে সাহায্য করো। আর যখন সে পশ্চাদ্ধাবন করে, তখন তারা আত্মগোপন করে এবং বলতে থাকে, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করো।’ (সহিহ আত-তারগিব:১৩৭৭)

সোম ও বৃহস্পতিবার
সোমবার ও বৃহস্পতিবার এই দুই দিন আকাশের দরজা এবং জান্নাতের ফটকগুলো খুলে দেওয়া হয়। দয়াময় আল্লাহ ক্ষমাপ্রার্থী বান্দার পাপমোচন করেন এবং সাপ্তাহিক নেক আমল কবুল করেন। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এরপর প্রত্যেক এমন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়, যে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না। তবে সেই ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না, যার ভাই ও তার মাঝে শত্রুতা রয়েছে। তখন বলা হয়- এই দুই জনকে রেখে দাও বা অবকাশ দাও, যতক্ষণ না তারা আপোষে মীমাংসা করে নেয়।’ (আহমদ: ১০০০৭)

রামজান মাসে
প্রতিবছর নাজাতের সুসংবাদ ও ক্ষমার পসরা সাজিয়ে রামজান মাস উপস্থিত হয়। মানবজাতিকে রহমত ও মাগফেরাতের ফল্গুধারায় সিক্ত করার জন্য এ মাসে আকাশের দরজা, রহমতের দরজা ও জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন রামজান মাস আগমন করে, তখন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, রহমতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহ, মেশকাত: ১৯৫৬)

ন্যায়বিচার ও ইফতারের সময়
যে বাদশা ইনসাফের সঙ্গে বিচারকার্য করে এবং রোজাদার যখন ইফতার করে সে মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা আসমানের দরজা খুলে দেন। ওই সময় দোয়া করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে হাদিসে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তিন ধরনের লোকের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। রোজাদার যতক্ষণ ইফতার না করে, সুবিচারক শাসকের দোয়া এবং মজলুমের (নির্যাতিতের) দোয়া। আল্লাহ তাআলা ওই দোয়াগুলো মেঘমালার ওপর (আকাশের) তুলে নেন এবং এর জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। রাব্বুল আলামিন বলেন, আমার মর্যাদার শপথ! আমি নিশ্চয়ই তোমার সাহায্য করব—কিছু দেরি হলেও।’ (তিরমিজি: ৩৫৯৮)

মানুষের প্রয়োজন পূরণের সময়
বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণ করলে আল্লাহ তাআলা আসমানের দরজা খুলে দেন, অন্যথায় তার জন্য আল্লাহ তাআলা আসমানের দরজা বন্ধ করে দেন। আমর ইবনে মুররা (রা.) থেকে বর্ণিত, মুআবিয়া (রা.)-কে আমর ইবনে মুররা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (স.)-কে আমি বলতে শুনেছি, গরিব-মিসকিন ও নিজ প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশে আগমনকারী লোকের জন্য যে নেতা নিজের দরজা বন্ধ করে রাখে, এ ধরনের লোকের দারিদ্র্য, অভাব ও প্রয়োজনের সময় আল্লাহ তাআলাও আকাশের দরজা বন্ধ করে রাখবেন। মুআবিয়া (রা.) এ কথা শোনার পর থেকে এক লোককে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশে নিযুক্ত করেন।’ (তিরমিজি: ১৩৩২)

নামাজের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায়
এক ফরজের পরবর্তী ফরজ নামাজ পড়ার জন্য অপেক্ষা করার সময় আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে মাগরিবের নামাজ পড়লাম। তারপর যারা চলে যাওয়ার চলে গেলেন এবং যারা থেকে যাওয়ার থেকে গেলেন। রাসুলুল্লাহ (স.) এত দ্রুতবেগে এলেন যে, তাঁর দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হতে লাগল। তিনি তাঁর দুই হাঁটুর ওপর ভর করে বসে বলেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের রব আসমানের একটি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাদের কাছে তোমাদের সম্পর্কে গর্ব করে বলছেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো, তারা এক ফরজ আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ আদায়ের অপেক্ষা করছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৮০১)

ইখলাসপূর্ণ আমলের সময়
ইখলাসের সঙ্গে লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ বলার কারণেও আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো বান্দা সততার সঙ্গে ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বললে তার জন্য আকাশের দরজাগুলো খোলা হয়। ফলে উক্ত কালিমা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যতক্ষণ সে কবিরা গুনাহ ত্যাগ করে। (তিরমিজি: ৩৫৯০)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে বিশেষ সময়ে ইখলাসের সঙ্গে নেক আমল ও বেশি বেশি দোয়া করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট