• বৃহস্পতিবার   ০২ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৮ ১৪২৮

  • || ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

বিশ্রাম নয়, বাদই দেওয়া হয়েছে মুশফিকুর রহিমকে

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০২১  

বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স করতে না পারলেও খুব বেশি খারাপ খেলেননি। ওপেনার নাঈম শেখ, অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর পরেই মুশফিকুর রহিমের রান। এরপরও টি২০ দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তাকে। নির্বাচকরা বিশ্রাম দেওয়ার কথা বললেও সত্যিটা ভালো করেই জানেন মুশফিক। দেশের ক্রিকেটের নীতিনির্ধারণী মহলের রোষে পড়ে সফরকারী পাকিস্তানের বিপক্ষে টি২০ সিরিজ খেলা হচ্ছে না তার। সমালোচকদের আয়নায় মুখ দেখতে বলেই হয়তো বিপদ ডেকে এনেছেন। বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ও সর্বশেষ টি২০ দল থেকে বাদ পড়া নিয়ে গতকাল সমকালের কাছে মনের আগল খুলে দিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। আকর্ষণীয় ও বিস্ম্ফোরক সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-


প্রশ্ন :দল থেকে আপনার বাদ পড়াকে কীভাবে নিয়েছেন?
মুশফিক :খেলোয়াড় হিসেবে উত্থান-পতন থাকে। এবার লম্বা সময় পর বাদ পড়লাম। বিশ্বকাপে নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী খেলতে পারিনি। সে কারণে যদি বাদ দিয়ে থাকে, তাহলে খেলোয়াড় হিসেবে আমি খুব ভালোভাবেই দেখছি। সামনে টেস্ট সিরিজ আছে, ওটার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ব্যাপার আছে। টি২০ খেললে হয়তো দু'দিন হাতে পেতাম; এখন ১০ থেকে ১২ দিন পাচ্ছি টেস্টের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য।
প্রশ্ন :গুঞ্জন ছিল, আপনি নিজে থেকেই নাকি বিশ্রাম চেয়েছিলেন?
মুশফিক : না। সত্যি বলতে, আমি এখনও ওই পর্যায়ে যাইনি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কাউকে বলতে হবে। হ্যাঁ, কভিডের পর যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য টানা পাঁচ/ছয় মাস খেলা খুব কঠিন। এরপরও বলব, এখনও আমি ওই রকম পর্যায়ে যাইনি। ব্যক্তিগত এবং দলগতভাবে হতাশার একটি বিশ্বকাপ গেছে। সেদিক থেকে আমি মুখিয়ে ছিলাম, এই তিনটি টি২০ ম্যাচে সুযোগ পেলে শুধরে নিয়ে ভালো পারফরম্যান্স করার চেষ্টা করব। যারা এই দলে আছেন, সবার জন্য শুভকামনা। আমি মনে করি, সবাই যোগ্য। সবার খেলা দেখার জন্যই মুখিয়ে আছি।
প্রশ্ন : একজন ক্রিকেটারকে বিচার করার জন্য একটি বিশ্বকাপই কি যথেষ্ট?
মুশফিক : বিশ্বকাপ অনেক বড় ইভেন্ট। এ রকম ইভেন্টে কেউ ভালো করবে, কেউ খারাপ করবে। কোনো দল ভালো খেলবে, কোনো দল সাদামাটা খেলবে- এটাই স্বাভাবিক। কেউ ভাবেনি, ভারতের মতো দল সেমিফাইনাল খেলবে না বা চ্যাম্পিয়ন হবে না। তারা কিন্তু কোয়ালিফাই করতে পারেনি। একদিক থেকে বলতে পারি- আমি যত বিশ্বকাপ খেলেছি, এই বিশ্বকাপ তুলনামূলক ভালো হয়েছে। তবে সেটা আমার প্রত্যাশার ধারেকাছেও যায়নি। এই কারণে যে কয়জন খেলোয়াড় বাদ পড়েছে, আমিও তাদের একজন। আমার কাছে এটা কখনোই নেতিবাচক মনে হয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সব সময় যেভাবে চেষ্টা করি, এখনও সেভাবে করছি। এখানেই সব শেষ হয়ে যায়নি। সামনে সুযোগ এলে চেষ্টা করব নিজেকে প্রমাণ করার।
প্রশ্ন : বলা হচ্ছে, টি২০-তে নতুন পথচলা শুরু। কীভাবে দেখছেন?
মুশফিক : এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ওয়ানডে বা টেস্টের মতো টি২০-তে আমি এখনও নিজের প্রতি সেভাবে সুবিচার করতে পারিনি। কয়েকটি ইনিংস বা ম্যাচে হয়তো ভালো খেলেছি। আমি মনে করি, টি২০-তে আমার উন্নতির আরও অনেক জায়গা আছে। আমি যখন সেরাটা দিতে পারব না, আমার জায়গায় অন্য কেউ আসবে স্বাভাবিক। পারফরম্যান্সই যদি বাদ দেওয়ার কারণ হয়, তাহলে স্বাগত জানাই। এরপর জাতীয় দলের টি২০ নেই। বিপিএল আছে, প্রিমিয়ার লিগ আছে। হৃদয় দিয়ে চেষ্টা করব আবার টি২০-তে ভালো করে ফিরে আসতে।
প্রশ্ন : দল ঘোষণার আগে নির্বাচক বা টিম ম্যানেজমেন্টের কারও সঙ্গে কথা হয়েছিল?
মুশফিক : আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আমি 'অ্যাভেইল অ্যাভেল' কিনা। আমি বলেছি- অবশ্যই আমি 'অ্যাভেইল অ্যাভেল'। দলে থাকব কি থাকব না, সেটা আমার হাতে না। আমি খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম এবং তারা মনে করেছে, এই টি২০-তে আমাকে তাদের ওই রকম প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন : বাদ পড়ার খবর প্রথমে কি মিডিয়া থেকে জেনেছেন?
মুশফিক : আমাকে জানানো হয়েছে। নান্নু ভাই জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে সামনে টেস্ট খেলা থাকায়।
প্রশ্ন : আপনি বারবার বলছেন যে আপনাকে 'বাদ' দিয়েছে। নির্বাচকরা বলেছেন 'বিশ্রাম' দেওয়ার কথা।
মুশফিক : সত্যিকারের সৎ ও সত্যি ভাবনাটাই বলা উচিত। দলের আগে, দেশের আগে তো কেউ না। সেখানে আমি তো নগণ্যতম একজন সদস্য।
প্রশ্ন : নির্বাচকরা কি বলেছেন, এটা কাদের সিদ্ধান্ত?
মুশফিক : আমাকে তারা বলেছেন- নির্বাচক কমিটি, ম্যানেজমেন্ট, হেড কোচ ও টিম ডিরেক্টর- সবাই মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আমাকে দলে রাখা হবে না।
প্রশ্ন : আপনাকে বাদ দিয়ে সিনিয়র ক্রিকেটারদের কি এই বার্তা দেওয়া হলো যে টি২০-এর বিবেচনায় তারা নেই।
মুশফিক : বলা কঠিন। যারা ছয়/সাত বছর খেলেছে, তারা জুনিয়র আর আমরা ১৫ বছর খেলছি, তাই সিনিয়র? এভাবে বলে দেওয়া কঠিন। এই বিশ্বকাপে হয়তো বা দেখেছেন টি২০-এর ক্রাঞ্চ মোমেন্টে অন্যান্য দল অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের কতটা গুরুত্ব দেয়। আমাদের দল একটু ভিন্ন। দু/তিনটি ম্যাচ খারাপ খেললে সবকিছু ভিন্ন হয়ে যায়। আমার মনে হয়, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা যে কোনো সংস্করণেই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন। টি২০-তে সেটা আরও বেশি।
প্রশ্ন : অভিজ্ঞ দল নিয়েও ভালো খেলতে না পারার কারণ কি?
মুশফিক : বিশ্বকাপের আগে আমরা তিনটি সিরিজ জিতেছি। হয়তো বা উইকেট ভিন্ন ছিল। দুই দলই কিন্তু ওই উইকেটে খেলেছে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি যে রকম দরকার, সে রকমই ছিল। ব্যক্তি খেলোয়াড় বা দল হিসেবে আমরাই সেরাটা দিতে পারিনি। এটা কারও দোষ না। আমি আরেকটু ভালো খেললে দল বের হয়ে আসতে পারত। একই সঙ্গে আমি মনে করি- আগের বিশ্বকাপগুলোর সঙ্গে এই বিশ্বকাপ মেলালে আমরা ফেভারিট ছিলাম না। আমরা ফাইনাল খেলতে বা চ্যাম্পিয়ন হতে যাইনি। টি২০-তে ভালো করতে হলে ভালো উইকেটে ধারাবাহিকভাবে খেলতে হবে।
প্রশ্ন : বাইরের কথাবার্তা বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সে কতটা প্রভাব ফেলেছে?
মুশফিক : আমরা যেসব কথা বলেছি, হয়তো অনেকে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। দেখেন, ওই সময়ে আমরা এত চাপে থাকি যে কে কী বলল, সেটা শুনে ধরে রেখে প্রতিক্রিয়া কখনও দেখাই না। আমার কথায় যদি ফিরে আসেন, আমি মানুষ হিসেবে এমন একটা দিকের ইঙ্গিত করেছি- পুরো জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের যেন একটু আয়নার সামনে দেখি। সেদিক থেকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে থাকলে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেখানে আমার কিছু করার নেই।
প্রশ্ন : বিশ্বকাপে আপনাদের শারীরিক ভাষা ভালো দেখাচ্ছিল না। কেন?
মুশফিক : শ্রীলঙ্কা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ক্লোজ দুটি ম্যাচ হারি। সবাই বলছেন, এ দুটি ম্যাচ জেতা উচিত ছিল। এ রকম ম্যাচ যখন জিতবেন না, স্বাভাবিকভাবে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ খারাপ থাকবে। খেলোয়াড়দের সাহসও কমে যায়। যে কোনো দলের বিপক্ষে খেলতে গেলে বিশ্বাসে একটু হলেও ঘাটতি দেখা দেবে। টি২০-তে ভারত, পাকিস্তানের কাতারে তো এখনও যায়নি বাংলাদেশ। আমাদের ছন্দটা দরকার ছিল। শুরুতে ম্যাচ বের করা গেলে টুর্নামেন্টের দৃশ্যপট অন্য রকম হতে পারত।
প্রশ্ন : টি২০-তে বাংলাদেশের উন্নতির পথ কী?
মুশফিক : উইকেট ভালো করতে হবে। মিরপুরের উইকেটে ঘরোয়া ক্রিকেটেও খেলা কঠিন। বিশ্বকাপে বা অন্যান্য দেশে ও রকম টার্ন থাকে না বা বলের ওঠানামা হয় না। মিরপুরেও স্পোর্টিং উইকেট হলে বোলাররা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, টিকে থাকার স্কিল শিখবে। উইকেট স্পোর্টিং হলে ব্যাটসম্যানদের শটের রেঞ্জ বাড়বে এবং দু/একবার ম্যাচে ক্লিক করলে উন্নতি হবে। ২০১২ এশিয়া কাপের আগে বিপিএলে সেরা উইকেট ছিল। ওই টুর্নামেন্টের পর এশিয়া কাপে রানার্সআপ হই। ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিক ছিলাম আমরা, ভারতের বিপক্ষে ২৯০ তাড়া করেছি। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ, শেষ ২০ ওভারে আমাদের ১৬০ রানের বেশি দরকার ছিল। তখনও আমাদের বিশ্বাস ছিল, কারণ কিছুদিন আগেই বিপিএলে আমরা ২০ ওভারে ১৬০ করেছি। সেই বিশ্বাস থেকেই ওই রান তাড়া করেছি।
প্রশ্ন : এত আলোচনার পর এখন কি উইকেটে পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয়?
মুশফিক : আমরা তো চাই। কিন্তু এই যে দেখেন, জাতীয় লিগে প্রথম কয়েকটা রাউন্ডে কত রান হয়েছে? দেড় দিন/দুই দিনে চারটা ইনিংস শেষ। আমি তো খেলা দেখি লাইভ- ইউটিউবে। আর কী বলব!

জাগ্রত জয়পুরহাট
জাগ্রত জয়পুরহাট