বৃহস্পতিবার   ১৯ মার্চ ২০২৬ || ৪ চৈত্র ১৪৩২

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১১:৩৬, ১৯ মার্চ ২০২৬

উৎসবভিত্তিক পর্যটন : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত

উৎসবভিত্তিক পর্যটন : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত
সংগৃহীত

বাংলাদেশ উৎসবপ্রিয় মানুষের দেশ। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা উৎসব সারা বছরজুড়েই এদেশের মানুষের জীবনে আনন্দ ও উদ্দীপনার সঞ্চার করে। এই উৎসবগুলো কেবল মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ নয়; উৎসবসমূহ দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ‘ফেস্টিভ্যাল ট্যুরিজম’ বা উৎসবভিত্তিক পর্যটন একটি শক্তিশালী পর্যটন প্রবণতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উৎসবকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব যেমন পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজা, বিশ্ব ইজতেমা ইত্যাদি অনুষ্ঠান দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এসব উৎসবের সময় মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণে বের হন।

অনেকেই শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময়ের জন্য দূরে গিয়ে প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে চান। আবার অনেকে দেশের বাইরে অবসর সময় উদযাপন করতে যান। ফলে উৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে এবং পর্যটন শিল্পে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়।

উৎসব ও পর্যটনের মধ্যে একটি স্বাভাবিক ও শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। উৎসব মানুষের মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ তৈরি করে এবং ভ্রমণ মানুষের মধ্যে নতুন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য জানার সুযোগ সৃষ্টি করে।

উৎসবের সময় পর্যটকেরা কেবল একটি স্থান ভ্রমণ করেন না; তারা সেই স্থানের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্য এবং সামাজিক জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে উৎসব পর্যটন সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত গ্রামীণ মেলা, বৈশাখী উৎসব, নৌকাবাইচ, লোকসংগীত উৎসব কিংবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলো পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। এছাড়া পারিবারিক মিলনমেলার মাধ্যমে দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব।

উৎসবের সময় পর্যটকেরা কেবল একটি স্থান ভ্রমণ করেন না; তারা সেই স্থানের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্য এবং সামাজিক জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হন। ফলে উৎসব পর্যটন সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

উৎসবভিত্তিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। উৎসবের সময় পর্যটকদের আগমনের ফলে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় বাজারগুলোতে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। এতে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত সক্রিয় হয়ে ওঠে।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত কক্সবাজার-এ ঈদের ছুটির সময় লাখো পর্যটকের সমাগম ঘটে। একইভাবে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত কুয়াকাটা এবং সুন্দরবনের নিকটবর্তী এলাকাগুলো, সিলেট, মৌলভীবাজার, ইত্যাদি উৎসবের সময় পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পার্বত্য অঞ্চলের শহর বান্দরবন ও রাঙ্গামাটি-তেও এ সময় পর্যটকের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। পর্যটকদের আগমনের ফলে স্থানীয় জনগণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রেতা, পরিবহনসেবা প্রদানকারী, ট্যুর গাইড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই সময়ে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান। ফলে উৎসবভিত্তিক পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উৎসব পর্যটন শুধু দেশীয় পর্যটকদের জন্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিদেশি পর্যটকেরা সাধারণত কোনো দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কাছ থেকে দেখতে আগ্রহী হন। বাংলাদেশের উৎসবগুলো সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং গ্রামীণ মেলা বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে।

একইভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও লোকজ অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবভিত্তিক পর্যটন একটি বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে।

ব্রাজিলের কার্নিভাল, জার্মানির অক্টোবরফেস্ট কিংবা ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটককে আকর্ষণ করে এবং বিপুল অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশেও পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে উৎসব পর্যটনকে একটি শক্তিশালী শিল্পে পরিণত করা সম্ভব।

যদিও উৎসবভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক, তবুও এর উন্নয়নের পথে কিছু বাধা রয়েছে। উৎসবের সময় পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে পরিবহনব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব পর্যটকদের জন্য অসুবিধা তৈরি করে।

এছাড়া পরিবেশ দূষণও একটি বড় সমস্যা। পর্যটকদের অসচেতনতা এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সময় প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই উৎসব পর্যটনের বিকাশের ক্ষেত্রে টেকসই পর্যটন নীতির অনুসরণ অত্যন্ত জরুরি।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে পারে।

উৎসব ও পর্যটন একে অপরের পরিপূরক। উৎসব মানুষের আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করে, আর পর্যটন সেই আনন্দকে বিস্তৃত করে নতুন অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দেয়।

একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে উৎসব পর্যটনের সুফল আরও বিস্তৃত হবে। ডিজিটাল যুগে পর্যটন প্রচারের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎসবগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে সহজেই সুন্দরভাবে তুলে ধরা সম্ভব। এতে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়বে এবং দেশের পর্যটন শিল্পে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে যদি পরিকল্পিতভাবে উৎসবভিত্তিক পর্যটনের উন্নয়ন করা যায়, তবে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, উৎসব ও পর্যটন একে অপরের পরিপূরক। উৎসব মানুষের আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করে, আর পর্যটন সেই আনন্দকে বিস্তৃত করে নতুন অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দেয়। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে উৎসবভিত্তিক পর্যটনকে শক্তিশালী করা গেলে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

তাই সময় এসেছে উৎসবকে কেবল সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে না দেখে এটিকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার। এতে করে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।

ড. সামশাদ নওরীন : সহযোগী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট