মৌসুমি প্রতিক্রিয়া নয়, দরকার বিজ্ঞানভিত্তিক ডেঙ্গু বাজেট
ঢাকা শহরে ডেঙ্গু এখন আর শুধুমাত্র মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই জরুরি ভিত্তিতে ফগিং, লার্ভিসাইডিং এবং বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না।
কারণ আমাদের অধিকাংশ ব্যয় এখনো প্রতিরোধের পরিবর্তে চিকিৎসা ও জরুরি প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থাপনার পেছনে চলে যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো একটি বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্য-উপাত্তনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজেট কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ব্যয়ের প্রতিটি খাতের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে কেবল দুই সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এডিস মশার বিস্তার এখন ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা শহর, পৌরসভা এবং গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই জাতীয় বাজেটে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণকে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্য মশা নিয়ন্ত্রণে দুই শতাধিক কোটি টাকা বরাদ্দের আলোচনা রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থ কতটা পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূভাবে ব্যয় হচ্ছে? শুধুমাত্র কীটনাশক ক্রয় ও স্প্রে কার্যক্রমে অধিকাংশ অর্থ ব্যয় করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না।
কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কেবল রাসায়নিক নির্ভর কার্যক্রম নয়; এটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার, নাগরিক সচেতনতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রক্রিয়া।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে তাই দেশের প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ এবং জেলা পরিষদের জন্য পৃথক ‘মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ তহবিল’ গঠন করা জরুরি।
দেশের জনসংখ্যা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বিস্তৃতি বিবেচনায় বছরে অন্তত ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত জাতীয় বাজেট গ্রহণ করা যেতে পারে। এই অর্থের একটি বড় অংশ মাঠপর্যায়ে ব্যয় করতে হবে, যাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কেবল রাসায়নিক নির্ভর কার্যক্রম নয়; এটি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার, নাগরিক সচেতনতা এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রক্রিয়া।
সিটি কর্পোরেশনগুলোতে ওয়ার্ডভিত্তিক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ কর্মসূচি, পৌরসভায় নিয়মিত লার্ভা সার্ভে ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জনসচেতনতা ও পানি জমার উৎস ধ্বংসে আলাদা বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় ‘ভেক্টর সার্ভেইলেন্স ইউনিট’ গঠন করে প্রশিক্ষিত কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত মশার ঘনত্ব, প্রজাতি এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
বাংলাদেশে এখনো তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় ঘাটতি রয়েছে। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা বেশি, কোথায় কীটনাশক কার্যকর নয়, অথবা কোন সময়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে, এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তাই বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য সংরক্ষণ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে জিআইএস ম্যাপিং, এআই-ভিত্তিক নজরদারি এবং অটোসাইডাল ট্র্যাপ-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর যৌথ মশা সার্ভিলেন্স গবেষণায় দুই বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকায় এডিস মশার সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় তিনটি প্রধান উৎসে, ফ্লাডেড ফ্লোর বা বেজমেন্ট (৪২.২৭%), বহুতল ভবনের বেজমেন্ট ও গাড়ি পার্কিং এলাকা (১৬.৮০%), এবং প্লাস্টিক ড্রাম (১৪.৭৪%)।
অর্থাৎ এই তিনটি উৎস থেকেই প্রায় ৭৪ শতাংশ এডিস মশার জন্ম হয়। এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে সীমিত সম্পদ ও বাজেটকে সবখানে সমানভাবে ব্যয় না করে, সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল প্রজননস্থলগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যয় করলে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করা সম্ভব।
ফ্লাডেড ফ্লোর বা বেজমেন্ট এলাকাগুলো ঢাকার দ্রুত নগরায়নের কারণে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। বহু ভবনের নিচতলায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। অথচ এই স্থানগুলো নিয়মিত নজরদারির বাইরে থেকে যায়।
তাই বাজেটের একটি অংশ ভবনের বাধ্যতামূলক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইনগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বরাদ্দ করা জরুরি। একইভাবে বহুতল ভবনের গাড়ি পার্কিং এলাকায় পানি জমা ও গাড়ি ধোয়ার কারণে মশার প্রজনন বাড়ছে। এজন্য সিটি কর্পোরেশন, রাজউক এবং ভবন মালিকদের সমন্বয়ে মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্লাস্টিক ড্রাম ও পানি সংরক্ষণের পাত্রগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির উৎস। ঢাকার অনেক এলাকায় অনিয়মিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে পানি জমিয়ে রাখে। কিন্তু এসব পাত্র সঠিকভাবে ঢেকে না রাখলে সেখানে সহজেই মশার প্রজনন ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত একদিন ডিটারজেন্ট বা সাবান দিয়ে ড্রাম পরিষ্কার করলে এডিস মশার প্রজনন কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব। তাই এই খাতে বড় অবকাঠামোগত ব্যয়ের চেয়ে কমিউনিটি সচেতনতা, ঢাকনা ব্যবহারের প্রচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি কার্যক্রমে বিনিয়োগ অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।
এই তিনটি প্রধান উৎসকে কেন্দ্র করে যদি ‘টার্গেটেড ভেক্টর কন্ট্রোল’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যায়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট স্থানভিত্তিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পানি অপসারণ এবং প্রজননস্থল ধ্বংসে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাজেট ব্যয় করা হয়, তাহলে বাস্তবসম্মতভাবে ৭০-৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ডেঙ্গু ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব। এতে সময়, অর্থ এবং জনবল, সবকিছুর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
তবে শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্ট বা জনসম্পৃক্ততাকে বাজেট পরিকল্পনার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় ক্লাব এবং আবাসিক সোসাইটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে নাগরিকরাও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে মশা নিয়ন্ত্রণকে শুধুমাত্র স্বাস্থ্য খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পরও যদি মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু সংক্রমণ কমে না, তাহলে সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পরও যদি মশার ঘনত্ব ও ডেঙ্গু সংক্রমণ কমে না, তাহলে সেই ব্যয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা জরুরি। প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচক নির্ধারণ করতে হবে এবং কোথায় কত লার্ভা কমেছে, কোন এলাকায় কীটনাশক কার্যকর, কিংবা সংক্রমণ কতটা হ্রাস পেয়েছে, এসব তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ ডেঙ্গুকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে চায় না। সঠিক পরিকল্পনা, তথ্য-উপাত্তভিত্তিক বাজেট বণ্টন, বিজ্ঞানসম্মত সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নতুন সরকারের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
মৌসুমি প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার। আসন্ন জাতীয় বাজেট সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে, যদি রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে প্রতিরোধকে চিকিৎসার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট










.webp)


