টেকসই কৃষির উন্নয়নে নির্বাচিত সরকারের করণীয়
কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি একটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কৃষিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ-এর উন্নয়নযাত্রায় কৃষির অবদান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কৃষিখাতে জনগণের প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। কারণ কৃষি খাতের সাফল্য মানে শুধু খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং মূল্য স্থিতিশীলতা, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
তবে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কৃষি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিজমি সংকোচন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে কৃষি একটি বড় নীতিগত পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষিখাতে বর্তমান প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ—
জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ঝুঁকি: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ধান ও সবজি উৎপাদন ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি মৌসুমের অনিশ্চয়তা বেড়েছে, যা কৃষকদের পরিকল্পনা ব্যাহত করছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: সার, কীটনাশক, জ্বালানি, শ্রমিক মজুরি, সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। ফলে কৃষকের লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। এতে কৃষি থেকে কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কৃষিজমি হ্রাস: নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে কৃষিজমি দ্রুত কমছে। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কৃষির বাইরে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা: কৃষক উৎপাদন করলেও ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেট অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের লাভ কমিয়ে দেয়। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন এবং সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা বড় সমস্যা।
প্রযুক্তি গ্রহণে বৈষম্য: উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও অনেক কৃষক তা ব্যবহার করতে পারেন না। তথ্যের অভাব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং আর্থিক সমস্যার কারণে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।
সর্বোপরি কৃষিতে যুবদের আকৃষ্ট করতে এবং ধরে রাখতে কৃষিতে 4IR (চতুর্থ শিল্প বিপ্লব) এর AI, IoT & বিগ ডাটা (রিয়েল টাইম সয়েল সেন্সর, কৃষিতে স্প্রে ড্রোন ইত্যাদি) প্রযুক্তির অপ্রতুলতা।
কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা: গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় সবসময় কার্যকর নয়। যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও গবেষণার ফলাফল দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
কৃষিতে 4IR (চতুর্থ শিল্প বিপ্লব) এর AI, IoT & বিগ ডাটা (রিয়েল টাইম সয়েল সেন্সর, কৃষিতে স্প্রে ড্রোন ইত্যাদি) প্রযুক্তির গবেষণা এবং প্রয়োগ আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
কৃষিশ্রমিক সংকট: গ্রাম থেকে শহরে শ্রম স্থানান্তরের কারণে কৃষিশ্রমিক সংকট দেখা যাচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
নতুন সরকারের জন্য সম্ভাব্য করণীয়—
জলবায়ু সহনশীল কৃষি উন্নয়ন: জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, খরা সহনশীল ধান এবং বন্যা সহনশীল প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (Food and Agriculture Organization-FAO) এর সঙ্গে যৌথ প্রকল্প বাড়ানো যেতে পারে।
কৃষি ভর্তুকি ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: সারের ভর্তুকি কার্যকর রাখা, কৃষি যন্ত্রপাতিতে সহজ ঋণ এবং জ্বালানি সহায়তা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি স্মার্ট ভর্তুকি ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুততর করা: যান্ত্রিকীকরণ কৃষিশ্রমিক সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কম্বাইন হারভেস্টার, ড্রোন প্রযুক্তি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি মাঠে দ্রুত সম্প্রসারণ করা জরুরি।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা: ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় বাড়াতে পারে। ডিজিটাল কৃষি বাজার (e-marketplace) চালু করলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে এবং কৃষক লাভবান হবে।
সংরক্ষণ ও সরবরাহ চেইন উন্নয়ন: কোল্ড স্টোরেজ, গুদাম, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষি লজিস্টিক উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষক বেশি লাভ পাবেন।
কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি: গবেষণায় বাজেট বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। আধুনিক বায়োটেকনোলজি, জিনোম গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক কৃষি প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি তথ্যপ্রযুক্তি ও স্মার্ট কৃষি: ডিজিটাল কৃষি তথ্য সেবা, মোবাইল অ্যাপ, আবহাওয়া পূর্বাভাস, রোগ শনাক্তকরণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কৃষিতে বিপ্লব আনতে পারে। কৃষিতে 4IR (চতুর্থ শিল্প বিপ্লব) এর AI, IoT & বিগ ডাটা (রিয়েল টাইম সয়েল সেন্সর, কৃষিতে স্প্রে ড্রোন ইত্যাদি) প্রযুক্তি সম্পৃক্ত করা অতীব জরুরি এবং সময়ের দাবি। স্মার্ট কৃষি ভবিষ্যতের কৃষির মূল চালিকা শক্তি।
কৃষি রপ্তানি বৃদ্ধি: কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ বাড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ, সার্টিফিকেশন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প উন্নয়ন করতে হবে। বিশেষ করে ফল, সবজি, মাছ এবং হালাল খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি অর্থায়ন সহজ করা: ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা এবং ফসল বীমা চালু করা জরুরি। এতে কৃষক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবেন।
কৃষক কার্ড চালু: কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতিসহ নানাবিধ সহায়তা পাওয়া। এছাড়া প্রণোদনা, ভর্তুকি ও দুর্যোগকালীন সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
যুবসমাজকে কৃষিতে আকৃষ্ট করা: কৃষিকে লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে পরিণত করতে পারলে তরুণরা কৃষিতে আগ্রহী হবে। কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ও স্টার্টআপ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় শক্তিশালী করা: কৃষি উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমন্বয়। কৃষি মন্ত্রণালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নীতি গ্রহণ থেকে মাঠপর্যায় বাস্তবায়ন পর্যন্ত একটি একীভূত কাঠামো প্রয়োজন।
কৃষিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা: বেসরকারি খাত কৃষিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি খাতে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কৃষির আধুনিকায়নে কার্যকর হতে পারে।
টেকসই কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষা: অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটি ও পরিবেশের ক্ষতি করছে। তাই সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা (IPM), জৈব সার, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: বাংলাদেশের কৃষিতে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন, কৃষি রপ্তানি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, স্মার্ট কৃষি উদ্যোক্তা। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগ থাকলে কৃষি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির খাত হতে পারে।
নতুন সরকারের জন্য কৃষি খাত একটি বড় সুযোগ এবং একই সঙ্গে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের একটি কৌশলগত খাত হিসেবে দেখতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগ এই চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিলে কৃষিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষকের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। তাই কৃষি নীতি হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, বাস্তবমুখী এবং ভবিষ্যতমুখী।
সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট






.jpg)










