সংস্কার পরিষদ ও স্থানীয় সরকার ইস্যুতে এপ্রিলে আন্দোলনে নামছে ১১ দল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সরকার গঠনের পর নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে কাজ শুরু করেছে তারা। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার পূরণে সরকার টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ করছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে দলগুলো।
তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের পর ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও অধিবেশন ডাকার বাধ্যবাধকতা মানেনি বিএনপি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিপরীতে প্রশাসক নিয়োগে ঝুঁকেছে তারা। এখন পর্যন্ত ১১ সিটি করপোরেশন এবং ৪২ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চেয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বলছেন, ভোট ছাড়াই স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দলীয় নিয়ন্ত্রণে নিতে নির্বাচনের আলাপ বন্ধ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ঈদের পর যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা না আসে তাহলে আন্দোলনের মাঠে নেমে পড়বে বলে জানিয়েছে এই ১১ দলীয় ঐক্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়নের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তখন পালিয়ে যান স্থানীয় সরকারের সব স্তরের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি। তাদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ে। সাময়িক দায়িত্ব পালনের জন্য সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
গত ১ মার্চ রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, ঈদের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। বিএনপি তাদের ৩১ দফায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার কথা বলেছে। কিন্তু এর মধ্যেই তারা সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সরকার জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
এক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের পদক্ষেপ সরকারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং একই সঙ্গে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ।
এদিকে, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গত ১৫ মার্চ ‘ভোট নয়, নিয়ন্ত্রণ : স্থানীয় সরকার নিয়ে বিএনপির ক্ষমতার অপব্যবহার’ শিরোনামে ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে আমরা এখন এক গভীর রাজনৈতিক ভণ্ডামির সময় অতিক্রম করছি। যে দল গণতন্ত্রের বুলি আউড়িয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলই আজ স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে জনগণের হাত থেকে সরিয়ে নিয়োগনির্ভর নিয়ন্ত্রণের পথে নিয়ে যাচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল, বাস্তবে আজ সেই স্বপ্নের বিপরীত এক রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম এ প্রসঙ্গে ঢাকা পোস্টকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন। কিন্তু প্রশাসক নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। বর্তমান সরকারের দলীয় প্রশাসক নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। সরকারের অনির্বাচিত সরকারের মতো আচরণ বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থীদের প্রশাসক নিয়োগকে হাস্যকর বলে উল্লেখ করে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, নিয়োগকৃত ব্যক্তিরা বিশিষ্ট নাগরিক নন, দেখা যাচ্ছে তারা মূল ভোটে হেরেও দলীয় সুবিধা পেলেন। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গাইবান্ধা-৩ আসনে বিএনপির জেলা সভাপতি জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরেছে। তাকে গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হলো। গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম-৪টি আসনের মধ্যে চারটাতেই ১১ দলীয় জোট, ৩টি জামায়াত একটিতে এনসিপি জিতেছে। সেখানে যিনি গত নির্বাচনে হেরেছেন তাকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা হাস্যকর বিষয়।
তিনি বলেন, ঈদের পরই ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বসবেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে সবার মন্তব্য মতামত জানতে চাওয়া হবে।
জানা গেছে, ঈদের পর আগামী ২৮ মার্চ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসবেন। সেখানে আগামী দিনের আন্দোলনের রূপরেখা নির্ধারিত হবে। সেদিনের বৈঠক থেকেই রাজপথে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে জামায়াত আরও শক্ত অবস্থানে যাবে। আমরা ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। প্রয়োজনে মাঠের কর্মসূচিও ঘোষণা হতে পারে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে সর্বত্র স্থানীয় প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে সরকার। এর মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ ইতোমধ্যেই দলীয়করণ করা শুরু হয়েছে। আওয়ামী এই সংস্কৃতির লিগ্যাসি বিএনপি সরকারের অনুসরণ দুঃখজনক।
তিনি বলেন, আমরা এ মাসটা দেখব। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে রাজপথে যেতে বাধ্য হবো আমরা।
আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো কায়দায় দলীয়করণের এক মহোৎসব শুরু হয়েছে, যা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে কেউ প্রত্যাশা করেনি। এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব শিক্ষা নেবে ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পুরোনো ধারা আবারও ফিরে আসছে।
তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই সনদের অঙ্গীকার থেকে পিছু হটা মানে জনগণের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করা এবং এর দায় সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির ঢাকা পোস্টকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সরকার টালবাহানা করছে। এটা যদি করা না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে সরকারই আমাদের আন্দোলনে যেতে বাধ্য করছে।
তিনি বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার ২০তম দফা ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন। যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতেই স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠন করেই সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তারা। নিজেদের প্রতিশ্রুতি নিজেরাই ভঙ্গ করে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী কায়দায় দলীয়করণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আমরা অবিলম্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি করেছি। না হলে রাজপথের আন্দোলনেই সরকারকে তফসিল ঘোষণায় বাধ্য করা হবে।
জেইউ/এমএন
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট


.webp)
.webp)












