৬৯ বছর পর রমজানের শেষ দশকে মুসল্লি শূন্য আল-আকসা, হচ্ছে না ইতিকাফ
রমজানের শেষ দশ দিন মানেই ফিলিস্তিনিদের পদচারণায় মুখর আল-আকসা মসজিদ। প্রতি বছর এই সময়ে হাজার হাজার মুসল্লি ইতিকাফ ও ইবাদতের জন্য এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে আল-আকসা এবং জেরুজালেমের পুরনো শহর পুরোপুরি মুসল্লিশূন্য করে রেখেছে ইসরায়েল।
মসজিদের করিডোরগুলোতে নেই কোনো হকারদের হাঁকডাক, নেই ইবাদতকারীদের সেই চেনা ভিড়। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত যে আঙিনা লোকে লোকারণ্য থাকার কথা, তা এখন খাঁ খাঁ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের অজুহাতে আল-আকসাকে অনেকটা বন্দিশালায় পরিণত করা হয়েছে।
বিগত ৪৬ বছর ধরে আল-আকসায় ইমামতি করা একজন প্রবীণ ইমাম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আল-আকসা আজ বড় একা। গত কয়েক দশকের মধ্যে এমন দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইতিকাফ করত, সেখানে এখন বড়জোর চার-পাঁচজন মানুষ নিয়ে আমাদের নামাজ পড়তে হচ্ছে। শুধু ভেতরের স্পিকারে আজান ও নামাজ হয় বলে বাইরের মানুষ কিছু শুনতেও পান না।
এই ইমাম জানান, বর্তমানে তিনি নিজের ঘরের পাশের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ান। সেখানে যখন মুসল্লিরা তাকে দেখে বলেন যে আজ আল-আকসার কণ্ঠ আমাদের মাঝে এসেছে, তখন তার বুক ফেটে কান্না আসে। সবাই একটাই প্রশ্ন করেন, হে শায়খ, আল-আকসা কবে খুলবে? কিন্তু তার কাছে কোনো উত্তর নেই।
পেশায় দন্তচিকিৎসক কিন্তু শখের বসে গত ১৫ বছর ধরে আল-আকসায় স্বেচ্ছায় আজান ও কোরআন তিলাওয়াত করেন মাজদ আল-হাদমি। তিনি এই পরিস্থিতিকে অবর্ণনীয় বঞ্চনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। মাজদ বলেন, বলা হচ্ছে নিরাপত্তার জন্য বা মরণাস্ত্রের হামলার ভয়ে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু আল-আকসার দেয়ালগুলো যেকোনো বাঙ্কারের চেয়ে শক্তিশালী। আসলে এটি একটি রাজনৈতিক চাল। ১১ মাস ধরে জেরুজালেমের মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার যে চেষ্টা চলছে, এটি তারই অংশ।
জেরুজালেম গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর এ নিয়ে মাত্র পাঁচবার আল-আকসায় জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। যার মধ্যে চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধটি সবচেয়ে দীর্ঘ এবং কঠোর।
জেরুজালেম গভর্নরেটের মিডিয়া ডিরেক্টর ওমর রাজুব আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের গ্রহণ করা প্রধান ১০টি পদক্ষেপ তুলে ধরেছেন।
ওমর রাজুব জানান, গত কয়েক দিনে আল-আকসাকে ঘিরে ইসরায়েলের কড়াকড়ি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এবার তারা বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের মাধ্যমে আল আকসাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তাদের এবারের পদক্ষেপগুলো হলো—
পূর্ণাঙ্গ অবরুদ্ধ অবস্থা: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে ঘোষিত জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে মসজিদটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইবাদতে নজিরবিহীন বাধা: ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম রমজানের শেষ দশ দিনে মুসল্লিদের নামাজ আদায় ও ইতিকাফ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আংশিক থেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ: পুরো মাস জুড়ে জুমা ও শনিবারগুলোতে ইতিকাফ করতে বাধা দেওয়ার ধারাবাহিকতায় এখন মসজিদটি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে।
প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে বাধা: মুসল্লি এবং মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো সরঞ্জাম বা রসদ ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
অস্ত্রধারী টহল: মসজিদের আঙিনায় ইবাদতকারীদের মাথার ওপর সার্বক্ষণিক সশস্ত্র সেনাসদস্যদের টহল জোরদার করা হয়েছে।
ইলমি মজলিস বন্ধ: মসজিদের ভেতরে দারুল হাদিসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা এবং শিক্ষার আসরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ওয়াকফ কমিটির ক্ষমতা খর্ব: জর্ডান পরিচালিত ইসলামি ওয়াকফ কমিটির প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইসরায়েল নিজেই মসজিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রশ্রয়: মুসলিমদের প্রবেশে বাধা দিলেও সকালে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
গণগ্রেপ্তার: প্রতিদিন মসজিদের আঙিনা থেকে সাধারণ মুসল্লিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
বিতাড়ন ও নিষেধাজ্ঞা: বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৫৩০ জনকে আল-আকসায় প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওয়াকফ কমিটির ২৪ জন কর্মচারী এবং ৬ জন ইমাম ও খতিব রয়েছেন।
গভর্নরেট কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিকে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের একটি পরিকল্পিত নীল নকশা হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, জরুরি অবস্থার অজুহাতে জর্ডান পরিচালিত ওয়াকফ কমিটির ক্ষমতা কমিয়ে আল-আকসার ওপর সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। একদিকে মুসলিমদের জন্য মসজিদ বন্ধ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের পুরিম উৎসব পালনের জন্য হাজার হাজার মানুষকে জেরুজালেমের রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিরা মনে করছেন, আল-আকসার এই নীরবতা কেবল নিরাপত্তার কারণে নয়, বরং পবিত্র শহরের জনতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
এনটি
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
















