বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ || ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১৬:৩০, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেসি-রোনালদো : দুই কিংবদন্তির দুই ভিন্ন পরিণতি

মেসি-রোনালদো : দুই কিংবদন্তির দুই ভিন্ন পরিণতি
সংগৃহীত

বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেলেও নিজের ফিটনেস নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানান, গত বিশ্বকাপ শেষে জাতীয় দল থেকে অবসরের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পাল্টান। সম্প্রতি নেশনস লিগে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচেও খেলেছেন তিনি।

শুরুর একাদশে উপস্থিতি ফিকে হয়ে যাচ্ছে রোনালদোর। দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখোমুখিও হচ্ছেন। তারপরও পর্তুগালের হয়ে খেলে যেতে চান। অন্যদিকে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি এমন এক বিদায় সংবর্ধনা পাচ্ছেন, বুয়েন্স আয়ার্সে যার সাক্ষী হতে যাচ্ছেন হাজার হাজার ভক্ত।

প্রায় দুই দশক ধরে এই জুটি বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসন ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। ফুটবলের শীর্ষস্থানে টানা টিকে থাকার যে মানদণ্ড তারা স্থাপন করেছেন, তার সমকক্ষ হতে পেরেছেন খুব কম খেলোয়াড়ই। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৫টি ব্যালন ডি’অরের ১৩টিই জয় করেন রোনালদো ও মেসি। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল সংখ্যা ও শিরোপার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা হয়ে উঠেছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গল্প।

যথাক্রমে ৪১ ও ৩৯ বছর বয়সে এই দুই কিংবদন্তি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই পরিণতির মুখোমুখি। মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিকে বিদায় জানাতে যাচ্ছেন এক উৎসবমুখর উদযাপনের মাধ্যমে। বিপরীতে রোনালদো পর্তুগাল দলে নিজের জায়গা ধরে রাখতে লড়াই করছেন এবং তার শেষ বছরগুলোতে কেবল অবসরের ভূমিকা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ।

সিংহাসন পুনরুদ্ধার করা এক চ্যাম্পিয়নের রাজকীয় বিদায়

ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান প্রমাণের আর কিছুই বাকি নেই মেসির। আটটি ব্যালন ডি’অর, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং দুটি কোপা আমেরিকা জয়। এসব সাফল্য এই আর্জেন্টাইনের ক্যারিয়ারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দেশের জার্সিতে যে স্বপ্নের পেছনে তিনি বছরের পর বছর ছুটেছেন, কাতারে তা ধরা দেয়। সেই জয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারজুড়ে থাকা সব বিতর্কের অবসান ঘটায়।

ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর অনেকে মনে করেছিলেন মেসি তার ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। ইউরোপীয় ফুটবল থেকে দূরে সরে যাওয়ায় মাঠে তার প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি তা ভুল প্রমাণ করেন। এখনও যেকোনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে সক্ষম মেসি একাই আর্জেন্টিনাকে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে নিয়ে যান এবং পুরো টুর্নামেন্টে আটটি গোল করেন।

তার ভূমিকা কেবল অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরা কোনো প্রতীকী উপস্থিতি ছিল না। আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথচলায় মেসিই ছিলেন মূল কারিগর। বয়স বাড়লেও বড় মঞ্চে তিনি যে এখনও সেরাটা দিতে পারেন, তা আরও একবার প্রমাণ করেন।

ফাইনাল পরবর্তী কিছু ঘটনার পর জাতীয় দল ও বেশ কিছু খেলোয়াড় সমালোচনার মুখে পড়লেও মেসি তার জায়গা অটুট রাখেন। তিনি ভরসা রেখেছিলেন নিজের বিশাল অর্জন আর আর্জেন্টাইন সমর্থকদের সঙ্গে তার অসাধারণ আত্মিক সম্পর্কের ওপর। তবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি কখনোই তার মনের আড়ালে ছিল না। চলতি গ্রীষ্মে বাবা হোর্হে মেসির প্রয়াণের পর সেই প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয়। এই ব্যক্তিগত ক্ষতি তার ক্যারিয়ারের এক সংবেদনশীল অনুভূতিতে বড় আঘাত হানে।

অবসর নাকি খেলা চালিয়ে যাওয়া, এই দুইয়ের দোলাচলে দাঁড়িয়ে মেসি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার এমন এক পথ বেছে নেন, যা দেশের জন্য তার অসামান্য অবদানের সাথে পুরোপুরি মানানসই। বুয়েন্স আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে আগামী ৬ অক্টোবর তার বিদায়ের দিন নির্ধারিত হয়েছে।

টিকিটের চাহিদা দিয়েই পরিস্থিতি ভালোভাবে বুঝতে পারা যায়। মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে ৮০,০০০ টিকিটের সবই বিক্রি হয়ে যায়। যেন মাঠে বল গড়ানোর আগেই ম্যাচটিকে ঘিরে এক জাতীয় উৎসব শুরু হয়ে গেছে।

আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের অধিনায়ককে যোগ্য সম্মান জানাতে এক বিশেষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। থাকছে এই উপলক্ষ্যের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি জার্সি। পুরো দেশ এখন সেই বিদায়বেলার অপেক্ষায়, যেটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের এক অসাধারণ অধ্যায়ের সমাপ্তি টানবে।

এখনই শেষ চান না রোনালদো

অন্যদিকে রোনালদো মেসির মতো একই পথে হাঁটতে মোটেও প্রস্তুত নন। মেসির চেয়ে দুই বছরের বড় এই পর্তুগিজ তারকা দলে নিজের ভূমিকা বদলে যাওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে শুরুর একাদশে সুযোগ কমার পরও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আঁকড়ে ধরে আছেন।

পর্তুগাল দলের সঙ্গে রোনালদোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সমর্থকদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষ করে তার বয়স বাড়া এবং একাদশে তার ওপর কতটা নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক চলছে। পর্তুগালের অধিনায়ক এখনও বিশ্বাস করেন যে, তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার বাকি আছে এবং তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখনও শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

গত আগস্টে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার সময় রোনালদো ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে চলতি বছরটি ফুটবলে তার শেষ বছর হতে পারে। তবে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের উপযোগী একটি চমৎকার ঐতিহ্য রেখে যেতে চান। ভোগ সাময়িকীকে তিনি বলেন, ‘ফুটবলে এটিই হয়তো আমার শেষ বছর এবং আমি এক দারুণ ঐতিহ্য রেখে যেতে চাই।’

কিন্তু সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে তার উপস্থিতি তার অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি তার বড় প্রমাণ। পুরো ম্যাচজুড়ে তিনি ছিলেন বেঞ্চে। বছরের পর বছর পর্তুগাল দলের তালিকায় যার নাম সবার আগে থাকত, তার জন্য এমন দৃশ্য বিরল। শেষবার যা দেখা গিয়েছিল ২০০৮ সালে!

পর্তুগাল ২-১ গোলে জয় পেলেও ম্যাচশেষে সব আলো কেড়ে নেন রোনালদোই। খেলার সুযোগ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে যান। সতীর্থদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সমর্থকদের অভিবাদন জানানো বা জয় উদযাপন করেননি।

নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা একজন অধিনায়কের এমন আচরণের কারণে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইসাথে প্রধান কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটারও সংকেত মিলেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের আল নাসরে একসাথে কাজ করার কারণে জেসুস তাকে খুব ভালো করেই চেনেন।

ম্যাচের পর জেসুস স্বীকার করেন যে তার রোনালদোর সাথে কথা বলা দরকার। কোচ জোর দিয়ে বলেন, অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতো রোনালদোর একাদশে থাকাও মাঠে তার পারফরম্যান্সের ওপরই নির্ভর করবে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে কেবল অতীত অর্জনের ওপর ভর করে নয়, বরং দলের প্রয়োজনেই তার মূল্যায়ন হবে। নিঃসন্দেহে ড্রেসিংরুমে রোনালদো এখনও এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে মাঠে তার ভূমিকা আর আগের মতো নিশ্চিত নয়।

মেসির সাথে তুলনাও অনেক সময় ক্ষুব্ধ করেছে রোনালদোকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঠে প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মুখে তার আর্জেন্টাইন প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ধরে স্লোগান শুনতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। এসব ঘটনা অনেক সময় তার মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং ইউরোপের মাঠ ছেড়ে আসার বহু পরও তাদের ঐতিহাসিক দ্বৈরথকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

দুই কিংবদন্তির দুই ভিন্ন পরিণতি

মেসি ও রোনালদোর মধ্যকার এই পার্থক্য কেবল অবসর নেওয়া বা খেলা চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে কে কীভাবে দেখছেন, তার পার্থক্য।

দেশের হয়ে সব স্বপ্নের ট্রফি জয় করে এই আর্জেন্টাইন এখন সর্বসাধারণের সঙ্গে উদযাপনের মধ্য দিয়ে মঞ্চ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে এই পর্তুগিজ তারকা দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়া দলে নিজের জায়গা ধরে রেখে এখনও অবদান রাখার সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

বছরের পর বছর ধরে তাদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুজনকে একে অপরের সাথে বেঁধে রেখেছিল। তারা পুরস্কার, পরিসংখ্যান আর প্রচারের আলো ভাগ করে নিয়েছেন। অথচ আজ সম্পূর্ণ বিপরীত দুটি সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মেসি প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার সব অর্জনকে উদযাপনের এক বিদায়বেলার জন্য। আর রোনালদো পর্তুগালকে আঁকড়ে ধরে আছেন। বিদায় শব্দটিকে তার শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছেন না। কারণ তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, মাঠে দেওয়ার মতো তার অনেক কিছু বাকি আছে।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ || ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১৭৩জন

সর্বশেষ

শিরোনাম