শুক্রবার   ০১ মে ২০২৬ || ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১০:৪০, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

মেধাবীর মৃত্যুতে শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি

মেধাবীর মৃত্যুতে শুধু পরিবারের নয়, রাষ্ট্রেরও ক্ষতি
সংগৃহীত

সম্প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনা আমাদের শোকাহত করেছে। প্রায়ই এমন ঘটনা বাকরুদ্ধ করে তোলে। ক্রমাগত এমন ঘটনা আমাদের বেশকিছু উপলব্ধির সুযোগ করে দেয়। একটা কঠিন সত্য হৃদয়কে নাড়া দেয়।

একজন মানুষের হত্যা বা মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং অর্থনীতির জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে যখন সেই মানুষটি শিক্ষিত, মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং রাষ্ট্রীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে থাকেন, তখন তার মৃত্যু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সীমা ছাড়িয়ে জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হয়।

বিষয়টি যথাযথভাবে অনুধাবন করার জন্য বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। আপনাদের অনেকেরই মনে থাকতে পারে বেশ কয়েক বছরে আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুস্তম, আবাসিক হলে নিজের কক্ষে দুর্বৃত্তের হাতে নিহত হয়েছিল। রুস্তম আমার বিভাগের এবং আমার সরাসরি ছাত্র ছিল। 

আমার প্রিয় ছাত্র রুস্তমের মরদেহ দাফন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু অনেকগুলো প্রশ্ন এবং বাস্তবতা আমাদের গ্রাস করেছিল। আমি, বিভাগের আরও একজন শিক্ষক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের একজন আবাসিক শিক্ষক মিলে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থীসহ নিহত ছাত্র রুস্তমের লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি গেলাম ঘটনার দিন রাতেই।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার চকনারায়ণ গ্রামে তার বাড়ি। সেখানে আমরা পৌঁছালাম রাত ২.১৫ মিনিটে। মরদেহ পৌঁছানোর সাথে সাথে কী এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হতদরিদ্র পিতা-মাতার দ্বিতীয় পুত্র রুস্তমের অনার্স পরীক্ষা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল। আর কয়েকটা দিন পরেই সে অনার্স ডিগ্রিটা হাতে পেয়ে যেত।

পিতা-মাতার দীর্ঘদিনের অভাব মেটানোর সাধ্যটিও প্রায় তার হাতের নাগালেই চলে এসেছিল। কিন্তু শেষ হলো না তার কাঙ্ক্ষিত যাত্রা। ভেঙে গেল বাবা-মায়ের তিল তিল করে গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। রুস্তমের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে একটিমাত্র ঘর। আর সাথে এটিও জানলাম যে, ওই একটি ঘরই তার পরিবারের শেষ সম্বল।

নেই কোনো জায়গা-জমি কিংবা অন্য কোনো সম্পদ। যতটুকু জমি-জমা ছিল তাও বিক্রি করে রুস্তমের পড়াশোনার পেছনে খরচ করেছিল তারা পিতা-মাতা। আমার সাথে যাওয়া বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাকে বারবারই অনুরোধ করছিল, রুস্তমের বাবা-মাকে সান্ত্বনা জোগাতে। কিন্তু আমার কোনো ভাষা জানা ছিল না সান্ত্বনা জানানোর।

একজন সন্তান যখন দীর্ঘসময় পড়াশোনা শেষ করে সংসারের হাল ধরার প্রস্তুতি নেয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন তার জীবন শুধু তার নিজের থাকে না। তিনি হয়ে ওঠেন একটি পরিবারের আশা, সমাজের সম্ভাবনা এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগের ফল। রুস্তম বেঁচে থাকলে আজ সে তার বাবা-মায়ের যেমন সম্পদে পরিণত হতো ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের অন্যতম সম্পদে রূপ নিত। রুস্তমকে গড়ে তুলতে তাদের পরিবারের যেমন বিনিয়োগ ছিল, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রেরও বিনিয়োগ ছিল।

একটা দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। সোনা, গ্যাস, জমি বা শিল্প নয়, দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন মেধাবী তার পড়াশোনা শেষে কর্মে যোগ দিলে তিনি শুধু নিজের পরিবার চালান না; তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ করেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করেন।

সম্প্রতি কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর যে হত্যাকাণ্ড সেটি আমাদের অনেক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তার এই জীবনাবসান মানে শুধু একটি জীবন নয়, রাষ্ট্র তার একজন প্রশাসক, নীতিনির্ধারক এবং জনসেবককে হারিয়েছে।

এই জায়গায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আসে, ‘Human Capital’ বা মানবসম্পদ। অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকার দেখিয়েছিলেন, মানুষ শুধু শ্রমশক্তি নয়; শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে একজন মানুষ রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান সম্পদে পরিণত হন।

একজন শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রকে বিপুল বিনিয়োগ করতে হয়। সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক বেতন, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাবৃত্তি, নিরাপত্তা-এসবের পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়। পরিবারও সমানভাবে ত্যাগ স্বীকার করে। জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে, নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের পড়াশোনা চালায়।

অর্থাৎ একজন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হওয়া শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পরিবার ও রাষ্ট্রের যৌথ বিনিয়োগের ফল। তাই যখন সেই মানুষটি সমাজে অবদান রাখার আগেই হারিয়ে যান, তখন ক্ষতিটা বহুমাত্রিক হয়। শুধু একটি চাকরি হারায় না, হারিয়ে যায় বহু বছরের শ্রম, সময়, অর্থ এবং স্বপ্ন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থিওডোর শুল্ট্‌স উন্নয়ন তত্ত্বে বলেছিলেন, একটা দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। সোনা, গ্যাস, জমি বা শিল্প নয়, দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন মেধাবী তার পড়াশোনা শেষে কর্মে যোগ দিলে তিনি শুধু নিজের পরিবার চালান না; তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ করেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করেন।

কাজেই একজন মেধাবীকে হত্যা করার মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের একটি সম্পদকে হত্যা করা। এই ক্ষতিকে অর্থনীতিতে ‘Opportunity Cost’ বা সুযোগ ব্যয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। একজন মেধাবী রাষ্ট্রীয় সুযোগে পড়াশোনার করার পর তিনি যদি বেঁচে থাকলে, পরবর্তী ৩০-৩৫ বছর কর্মজীবনে রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের অবদান রাখতে পারেন।

পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে পারেন। এই সম্ভাব্য সব অবদান এক মুহূর্তে থেমে যায়। অর্থাৎ আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাই না; আমরা হারাই তার ভবিষ্যৎ অবদানও।

এখানে ‘লাইফটাইম আর্নিং মডেল’ নামের একটি অর্থনৈতিক ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। এই মডেল অনুযায়ী একজন মানুষের সম্ভাব্য আজীবন আয়, কর প্রদান, সামাজিক অবদান এবং উৎপাদনশীলতার হিসাব করা হয়। একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা তার কর্মজীবনে কয়েক কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারেন।

বেতন, কর, নীতিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক প্রভাব প্রভৃতি সব মিলিয়ে তার মূল্য শুধু মাসিক বেতনে সীমাবদ্ধ নয়। তার অকাল মৃত্যু মানে সেই সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি আছে। আর সেটি হলো সামাজিক আস্থা হারানো।

যখন মানুষ দেখে যে একজন মেধাবী, শিক্ষিত, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিরাপদ নন, তখন সাধারণ মানুষের মনে ভয় জন্মায়। তারা ভাবতে শুরু করে, ‘পড়াশোনা করে কী লাভ? রাষ্ট্র কি আমাদের রক্ষা করতে পারবে?’

এই ভয় সমাজে হতাশা তৈরি করে। তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে। অনেকেই বিদেশমুখী হয়। কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় চাকরির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই জায়গায় আসে মেধাপাচারের প্রসঙ্গ। একজন শিক্ষার্থী নিজের দেশে পড়াশোনা করে, রাষ্ট্রের খরচে বড় হয়, কিন্তু পরে বিদেশে চলে যায়। এটিও রাষ্ট্রের ক্ষতি।

কারণ বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু ফল ভোগ করছে অন্য দেশ। তবে আরও ভয়ংকর হলো যখন একজন মেধাবী নাগরিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা সামাজিক অস্থিরতার কারণে প্রাণ হারান। একে বলা যায় ‘ফোর্সড ব্রেইন লস’- জোরপূর্বক মেধা হারানো। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা।

মাক্স ভেবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যার প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন কর্মকর্তা নিহত হওয়া মানে শুধু একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়া নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিফলন।

আমরা প্রায়ই সেতু, রাস্তা, ভবন, মেট্রোরেল-এসবকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো হলো মানুষ। একটি সেতু ভেঙে গেলে নতুন সেতু বানানো যায়; কিন্তু একজন মেধাবী মানুষ পরপারে চলে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না।

অমর্ত্য সেন তার ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রেচ’-এ বলেছেন, উন্নয়ন মানে শুধু আয় বৃদ্ধি নয়; মানুষের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি। একজন তরুণ কর্মকর্তা যখন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই হারিয়ে যান, তখন শুধু তার আয় নয়-তার সক্ষমতা, সম্ভাবনা এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার শক্তিও হারিয়ে যায়। একটি দেশ তখন শুধু একজন কর্মচারী হারায় না; হারায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই ক্ষতি আরও গভীর। এখানে একজন সন্তান প্রায়ই পুরো পরিবারের ভরসা। বাবা-মা তাদের শেষ সঞ্চয় দিয়ে সন্তানকে পড়ান। গ্রামের একটি পরিবার হয়তো একমাত্র শিক্ষিত সন্তানটির দিকে তাকিয়ে থাকে-সে চাকরি পাবে, সংসার বদলাবে, ছোট ভাইবোনদের পড়াবে, পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে তুলবে। সেই মানুষটি হারিয়ে গেলে একটি পরিবারের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, মানসিক শক্তি নষ্ট হয়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়।

একজন মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচেন না। তিনি সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, সম্পর্ক-সবকিছু সমাজের সম্পদ। একজন শিক্ষক মারা গেলে জ্ঞানের ক্ষতি হয়, একজন চিকিৎসক মারা গেলে চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষতি হয়, একজন কর্মকর্তা মারা গেলে প্রশাসনিক ক্ষতি হয়। তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি শিক্ষিত নাগরিক এক একটি ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’-একটি অমূল্য সম্পদ।

আমরা প্রায়ই সেতু, রাস্তা, ভবন, মেট্রোরেল-এসবকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখি। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো হলো মানুষ। একটি সেতু ভেঙে গেলে নতুন সেতু বানানো যায়; কিন্তু একজন মেধাবী মানুষ পরপারে চলে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। একজন দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করতে রাষ্ট্রকে ২৫-৩০ বছর সময় ব্যয় করতে হয়। সেই ক্ষতি এক দিনে পূরণ হয় না।

বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি আমাদের মানবসম্পদ রক্ষা করতে পারছি? আমরা কি মেধাবী তরুণদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করছি? আমরা কি বুঝতে পারছি যে একজন মানুষের মৃত্যু মানে রাষ্ট্রীয় সম্পদের মৃত্যু?

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

অনলাইন জরিপ

শুক্রবার   ০১ মে ২০২৬ || ১৭ বৈশাখ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১৭৩জন