বৃহস্পতিবার   ০৫ মার্চ ২০২৬ || ২০ ফাল্গুন ১৪৩২

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১০:৩৯, ৪ মার্চ ২০২৬

এপ্রিলে পূর্ণ সিলেবাসে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা, ফল জুনে

এপ্রিলে পূর্ণ সিলেবাসে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা, ফল জুনে
সংগৃহীত

দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রাথমিকের স্থগিত হওয়া গত বছরের বৃত্তি পরীক্ষা। আগামী ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে চার দিনে এই পরীক্ষা আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। কোনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস নয়, বরং পঞ্চম শ্রেণির পূর্ণ সিলেবাসে গত বছরের বই থেকেই পাঁচ বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের পরীক্ষায় অংশ নেবে শিক্ষার্থীরা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবারই প্রথম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরাও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশ নেবে। তবে ফল প্রকাশ ও বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটা ও পৃথক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মান যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এরই মধ্যে পরীক্ষার নতুন খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করেছে। এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই এই পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

দীর্ঘ আইনি জটিলতা কাটিয়ে আগামী ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রাথমিকের স্থগিত হওয়া বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজনের জোর প্রস্তুতি চলছে। কোনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাস নয়, বরং পঞ্চম শ্রেণির পূর্ণ সিলেবাসে চার দিনে মোট ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। জুন মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্যথায় বৃত্তির জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের রায়ে সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি, রেজিস্টার্ড কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনার পর পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে।

এ বছর সর্বমোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৩৩ হাজার ট্যালেন্টপুল এবং ৪৯ হাজার ৫০০ জন সাধারণ বৃত্তি পাবে / ছবি- সংগৃহীত

বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সময় অত্যন্ত সীমিত। এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই কেন্দ্রসংকট এড়াতে পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু এটি মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা, তাই নম্বর বা বিষয় কমানোর সুযোগ নেই। আমরা পূর্ণ সিলেবাসেই পরীক্ষার সুপারিশ করেছি।’

তিনি আরও জানান, ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিলের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার একটি প্রস্তাব আলোচনায় আছে। তবে এটি চূড়ান্ত নয়। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। আবার জুনের আগে ফল প্রকাশের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ না হলে বৃত্তির অর্থ বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার শঙ্কা আছে। এ কারণেই দ্রুত সময়সূচি নির্ধারণে জোর দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরাও একই প্রশ্নপত্রে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে। তবে প্রতিযোগিতার সমতা বজায় রাখতে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে; যেখানে মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্যাটাগরিতে মেধা প্রমাণের সুযোগ পাবে

পরীক্ষার কাঠামো ও কোটা পদ্ধতি

অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পাঁচ বিষয়ে ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তাব করা রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, গণিতে ৩০০ নম্বর এবং বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ে ৫০ নম্বর করে ১০০ নম্বরের সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হবে।

তবে একই প্রশ্নপত্রে সরকারি ও বেসরকারি— সব ধারার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও ফল প্রকাশ ও বৃত্তি বণ্টনে থাকবে আলাদা মোডালিটি। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এবার মোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুল এবং সাড়ে ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী সাধারণ বৃত্তি পাবে। মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরাও একই প্রশ্নপত্রে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে / ছবি- সংগৃহীত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টেকে জানান, ফল প্রকাশের সময় সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার্থীরা নিজেদের কোটার মধ্যে প্রতিযোগিতা করবে। অর্থাৎ বেসরকারি শিক্ষার্থীরা বেসরকারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবং সরকারি শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ট্যালেন্ট ও সাধারণ বৃত্তির জন্য প্রতিযোগিতা করবে। তবে প্রশ্নপত্র এক হওয়ায় দুই ধারার শিক্ষার্থীদের অর্জন তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে।

এ বছর সর্বমোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হবে, যার মধ্যে ৩৩ হাজার ট্যালেন্টপুল এবং ৪৯ হাজার ৫০০ জন সাধারণ বৃত্তি পাবে। ট্যালেন্টপুলে নির্বাচিতরা মাসিক ৩০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা ২২৫ টাকা করে পাবে। এছাড়া উভয় ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা করে পাবেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে

এ বিষয়ে ডিপিই মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, “সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে কেউ ‘আন্ডার এস্টিমেট’ করলে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ফল বিশ্লেষণেই স্পষ্ট হবে। আর এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে সহায়ক হবে।”

অন্যদিকে, বেসরকারি শিক্ষকদের একটি অংশ দ্রুততম সময়ে বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন ও প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এরই মধ্যে কয়েক জায়গা থেকে কেউ কেউ বিভিন্নভাবে সময় বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন। তবে অধিদপ্তর বলছে, শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উঠেছে। দীর্ঘসূত্রতা হলে প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়বে।

এদিকে, বই–সংকটের সম্ভাবনা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। এ প্রসঙ্গে অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারি বিদ্যালয়ে বইয়ের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কোনো শিক্ষার্থী বই হারিয়ে ফেললে বা বিক্রি করে দিলে রিজার্ভ কপির মাধ্যমে সহায়তা করা হতে পারে। এ বিষয়ে প্রয়োজন হলে উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সময় অত্যন্ত সীমিত। এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই কেন্দ্রসংকট এড়াতে পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু এটি মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা, তাই নম্বর বা বিষয় কমানোর সুযোগ নেই। আমরা পূর্ণ সিলেবাসেই পরীক্ষার সুপারিশ করেছিআবু নূর মো. শামসুজ্জামান, ডিজি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

যেভাবে থমকে যায় প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা

দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সাল থেকে পুনরায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সে অনুযায়ী কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তা ‘বৈষম্যমূলক’ দাবি করে বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন–সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষক হাইকোর্টে রিট করেন। শুনানি শেষে আদালত প্রথমে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং পরে রায়ে সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি, রেজিস্টার্ড কিন্ডারগার্টেন ও অনুমোদিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা আয়োজন সম্ভব হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়।

আগামী বছর বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে— শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন / ছবি- ঢাকা পোস্ট 

এরপর সরকার কৌশলী অবস্থান নিয়ে বৃত্তি পরীক্ষার বদলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে আবারও বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন-সংশ্লিষ্টরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে এক আদেশে ‘বৃত্তি পরীক্ষা’ এবং এর বিকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ উভয় কার্যক্রম এক মাসের জন্য স্থগিত করেন।

একই দেশের নাগরিক হিসেবে তাদেরও (বেসরকারি শিক্ষার্থী) এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের আগেই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বৃত্তি বণ্টনে একটি অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছেআ ন ম এহছানুল হক মিলন, মন্ত্রী, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়

সর্বশেষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পর বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদেরও বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন সরকারের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, ‘একই দেশের নাগরিক হিসেবে তাদেরও (বেসরকারি শিক্ষার্থী) এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের আগেই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বৃত্তি বণ্টনে একটি অনুপাত নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।’

বৃত্তির আর্থিক কাঠামো তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ট্যালেন্টপুলে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা এবং মাসিক ৩০০ টাকা পাবে। আর সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্তরা এককালীন ২২৫ টাকা ও মাসিক ২২৫ টাকা পাবে। আগামী বছর বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ