‘মোর কাছত দুঃখ আসিবে ক্যামন করিয়া, মোর নামটাইতো সুখী’
গ্রামীণ পথের দুপাশে গাছের সারি। ডানে-বাঁয়ে ফসলি জমি, বসতঘর, স্কুল, চায়ের দোকান—এসব রেখে পথ এঁকেবেঁকে মিশে গেছে দূর দিগন্তে। সে পথের দু-ধারের ফসলি জমিতে এখন কৃষকের আলু তোলার ব্যস্ততা।
সেখানে কথা হয় একদল নারীর সঙ্গে। রিতা রানী, সোনামণি, মেরিনা, নদী, মিনতি—ভিন্ন নামের হলেও তাঁদের কষ্টটা অভিন্ন। তাঁরা সবাই পেশায় কৃষিশ্রমিক। কারও স্বামী মারা গেছেন, আবার কারও স্বামী থেকেও নেই। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন পরিশ্রম করে জীবন ও জীবিকা চালাচ্ছেন তাঁরা। সারা বছরই কাজের নিশ্চয়তা পেলে খুশি তাঁরা।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মধ্য বালিয়াডাঙ্গীতে কথা হয় এই নারীশ্রমিকদের সঙ্গে। তখন সেখানে ১৬ জন একসঙ্গে খেত থেকে আলু তুলছিলেন। জানা গেল, তাঁরা সবাই তুলসীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
বছর বিশেক আগে স্বামী মারা গেছেন সোনামণির (৬০)। সেই থেকে কৃষিশ্রমিকের কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘হামরা কখনো জমিত, আবার কখনো মানুষের বাড়িত কাজ করে খাই। হামার কুনো দুঃখ নাই।’ কেন দুঃখ নেই, জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে তাঁদের মনের ভেতরে জমা কষ্টগুলো। সোনামণি বলেন, নিজের সহায়সম্বল নেই। ছেলে নিজের সংসার নিয়েই হিমশিম খাচ্ছেন। দিনমজুরির টাকা দিয়ে চলেন। খেতে যখন যে কাজ পান, সেটাই করেন। সকাল আটটায় কাজে এসে বিকেলে বাড়ি ফেরেন। এখন আলু তোলার সময়। চারজনের একটি দলে আলু তোলান তাঁরা। এক বস্তা আলু তুলতে পান ৩০ টাকা। কোনো দিন ১২০ টাকা হয় আবার কোনো দিন ১৫০ টাকা হয়।
ছেলেসন্তান না হওয়ায় রেজিনা বেগমের (৪৮) স্বামী তাঁকে ছেড়ে আরেকটি বিয়ে করেন। তিন মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ঠাঁই নেন তিনি। এখন দিনমজুরি করে চলে তাঁর জীবন। তিনি বলেন, ‘কষ্ট করিয়াই একখান মাইক (মেয়েকে) বিহা দিছু। ছোট দুইখান পড়েছে। মুই কহিছু তোমরা পড়েন, মুইতো আছু।’
গাছ টেনে তুলে মাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা আলু তুলতে ব্যস্ত সুখী বেগম (৩৬)। নামটি তাঁর সুখী হলেও জীবনটা কিন্তু সংগ্রামের। সুখী বলেন, ‘কষ্ট কী? মোর কাছত দুঃখ আসিবে ক্যামন করিয়া? মোর নামটাইতো সুখী!’ বলতে বলতে আনমনা হয়ে গেলেন তিনি। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জানালেন, তাঁর আট বছরের একটা মেয়ে আছে। মেয়ের জন্মের আগেই স্বামী মারা গেছেন। এরপর কখনো ভাইয়ের সংসারে, কখনো বোনের সংসারে বোঝা হয়ে দিন কাটে তাঁর। একসময় শুরু করেন কৃষিশ্রমিকের কাজ। সকাল বেলায় কাজে এসে বাড়ি ফেরেন বিকেল পাঁচটায়। মাঝে থাকে খাবারের বিরতি। দৈনিক মজুরি মেলে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
কদিন থেকে শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না মেরিনা রানীর (৫৭)। তবু কাজে আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। মেরিনা বলেন, ‘কাজে না আসলে খাব কী? অ্যালা ফের আলুর দাম কম যাছে। আলুর দাম বেশি হইলে এক বস্তা আলু তুলিলে মহাজন ৪০ টাকা দিত। অ্যালা দেছে ৩০ টাকা। ফসলের ভালো দাম মিলিলে হামরাও বেশি টাকা পাও।’ তাঁদেরই একজন রিতা রানী (৫০) জানান, রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কোনো কিছুই তাঁদের ঘরে আটকে রাখতে পারে না। কাজ করা চাই। নয়তো খাবার জুটবে না।
ওই এলাকার বাসিন্দা আইয়ুব চৌধুরী (৬৭) বললেন, এই এলাকার অধিকাংশ পরিবার অসচ্ছল। অনেকের নিজের ভিটেটুকুও নেই। কাজ করেই চলে তাঁদের সংসার। সারা বছর কাজ পেলেই তাঁরা খুশি।
সূত্র: প্রথম আলো


.jpg)

.avif)






