সোমবার   ০৯ মার্চ ২০২৬ || ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১২:০৭, ৯ মার্চ ২০২৬

পাঁচ বছরের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে সম্মানজনক অবস্থানে যেতে চাই

পাঁচ বছরের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে সম্মানজনক অবস্থানে যেতে চাই
সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর সারা দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেও আমূল পরিবর্তন আসে। সেই সন্ধিক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) বা প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। বিগত দেড় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে তার ভূমিকা, একাডেমিক সংস্কার নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এখন পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যগুলো নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সাদ আদনান রনি।

ঢাকা পোস্ট : আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করি ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে টিচিং অ্যান্ড রিসার্চসহ একাডেমিক অ্যাক্টিভিটিস প্রপারলি চালানো। আমরা যে সময়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছি, গণঅভ্যুত্থানের পরপর, আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা। তাতে আমাদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়েছে। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে, অনেক এনার্জি আমাদের সেখানে দিতে হয়েছে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে আস্তে আস্তে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলো, সবকিছু ঠিকঠাক হলো। এরপর আমরা নজর দিয়েছি কীভাবে অন্যান্য বিষয়, বিশেষ করে একাডেমিক অ্যাক্টিভিটিসগুলো আরও ইমপ্রুভ করা যায়।

ঢাকা পোস্ট : প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) হিসেবে আপনার কাজের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো কী কী?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের (একাডেমিক) কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে যেখানে কাজ করতে হয়। যেমন—র‌্যাংকিং কমিটি। আমাদের একটা র‌্যাংকিং কমিটি আছে। এই কমিটির প্রধান হচ্ছেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক)। র‌্যাংকিং এটা একক কোনো অফিসের বিষয় নয়। এখানে অনেকগুলো অফিস সম্মিলিতভাবে কাজ করে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম যদি সুষ্ঠুভাবে চলে তবেই বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে আস্তে আস্তে ভালো করে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সন্ধিক্ষণে দায়িত্ব নিয়ে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ-এর প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল স্থবির হয়ে পড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা। তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক পুনস্থাপন এবং একটি উৎসাহব্যঞ্জক গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে গবেষণা অনুদান বণ্টন এবং শীর্ষ গবেষকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে তিনি ক্যাম্পাসে এক নতুন শিক্ষা-উদ্দীপনার সঞ্চার করেছেন

ঢাকা পোস্ট : র‌্যাংকিং ও একাডেমিক উন্নয়নে আপনারা কীভাবে কাজ শুরু করেছেন? 

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : শুরুতেই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থান গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। আমাদের শক্তি এবং সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বেশকিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি কাজ হলো—সারা বছরজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় একাডেমিক ও বিশেষ করে গবেষণা কার্যক্রমের সঠিক নথিভুক্তি নিশ্চিত করা। আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা যে নিরলস গবেষণা করছেন, সেগুলোর একটি যথাযথ প্রতিফলন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকে, আমরা সেই ব্যবস্থা করছি। এতে র‍্যাংকিং কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো সহজেই পাবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক র‍্যাংকিং অর্জনে সহায়ক হবে।

শিক্ষাই আমাদের অগ্রাধিকার—ঢাকা পোস্টের মুখোমুখি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ / ছবি- সংগৃহীত

শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের ঠিক কোন জায়গাগুলোতে আরও উন্নতি করা প্রয়োজন, সেগুলো আমরা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছি। এই চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলোতে আমরা ধাপে ধাপে মানোন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সুসংহত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বিদেশি খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের মাধ্যমে বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। শিক্ষকদের গবেষণাকর্মের সঠিক ডিজিটাল নথিভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বিদেশি বিশেষজ্ঞ স্কলারদের নিয়মিত ক্যাম্পাস ভিজিট নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে

আমাদের কার্যক্রমের একটি দিক হলো নিয়মিত একাডেমিক কর্মকাণ্ড—যেমন পঠনপাঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা। অন্য দিকটি হলো গবেষণা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও আমরা গবেষকদের নিরন্তর উৎসাহিত করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যেন সম্মিলিতভাবে মানসম্মত গবেষণায় মনোনিবেশ করতে পারেন। ব্যক্তি গবেষককে সম্মান জানানোর পাশাপাশি আমরা একটি গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

চীনের ন্যাশনাল মেরিন এনভায়রনমেন্টাল ফোরকাস্টিং সেন্টারের মহাপরিচালক ড. ফুজিয়াং ইউ-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাবি উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন / ছবি- সংগৃহীত

গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টপ-রেটেড’ বা শীর্ষ গবেষকদের—অর্থাৎ যারা বিশ্বখ্যাত কিউ১ (Q1) এবং কিউ২ (Q2) জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন—তাদের স্বীকৃতি দিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। গত এক বছরে যারা এই মানের জার্নালে কাজ করেছেন, এমন প্রায় ৩০০ জন গবেষককে আমরা সার্টিফিকেট ও সম্মাননা প্রদান করেছি। যদিও প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি, কারণ তথ্যগত সীমাবদ্ধতা বা কারিগরি কারণে অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে আমরা আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে।

চীনের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI+), সমুদ্র গবেষণা এবং ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজিতে বিশেষ সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। চীনের কারিগরি সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অত্যাধুনিক ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র এবং সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যৌথ সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক ওষুধের সংশ্লেষ ঘটিয়ে ফার্মেসি শিক্ষার আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে চলছে

এই উদ্যোগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় যে ভালো কাজের স্বীকৃতি দেয় এবং গবেষকদের যথাযথ সম্মান জানায়—এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছেছে। বিশেষ করে তরুণ গবেষকদের মধ্যে গবেষণার প্রতি এক ধরনের বিশেষ আগ্রহ ও উৎসাহের সঞ্চার হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা পোস্ট : বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুদান বিতরণ নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা প্রতি বছরই গবেষণার জন্য বিশেষ অনুদান প্রদান করি। এক্ষেত্রে আগ্রহী শিক্ষক ও গবেষকরা তাদের নির্দিষ্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা গবেষণা প্রস্তাব জমা দেন। আমরা সেই প্রস্তাবনাগুলোর গুণগত মান যাচাই করে অনুদান বণ্টন করি। গত বছর এই প্রক্রিয়াটি আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল যারা প্রকৃত অর্থেই গবেষণার প্রতি নিবেদিত এবং যাদের কাজের মান উন্নত, তাদের কাছেই যেন এই সহায়তা পৌঁছে যায়।

আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্কার নিয়ে প্রশাসনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরছেন অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ / ছবি- সংগৃহীত

যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি আমরা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পেরেছি, তাই গবেষকদের মধ্যে একটি নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, মানসম্মত গবেষণা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় পাশে থাকবে এবং যথাযথ সহায়তা করবে। যদিও এই ফান্ডের পরিমাণ খুব বেশি নয়, তবে আমাদের যেটুকু সামর্থ্য আছে, তা আমরা শিক্ষকদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই বণ্টন করছি। এখানে মেধা ও যোগ্যতা বলতে আমি তাদের জমা দেওয়া গবেষণা প্রকল্পের মান এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে বুঝিয়েছি। এর ফলে গবেষকরা নতুন করে উৎসাহিত হচ্ছেন এবং তারা অনুধাবন করছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণার পরিবেশ উন্নয়নে আন্তরিকভাবে আগ্রহী।

ঢাকা পোস্ট : র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান উন্নয়নে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মানদণ্ড। আমরা বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছি। একদিকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো কার্যকর ‘ক্রেডিট ট্রান্সফার সিস্টেম’ প্রবর্তনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা আদান-প্রদান আরও সহজ হবে। পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে ও তাদের অবস্থান আরামদায়ক করতে বিদ্যমান ‘ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল’ আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন করা হচ্ছে। ভর্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে

আমাদের এই কার্যক্রমের মূল ক্ষেত্রগুলো হলো—শিক্ষার্থী বিনিময়, শিক্ষক ও গবেষক বিনিময় এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করা। এ লক্ষ্যে আমরা একটি কার্যকর ও গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে মনোনিবেশ করেছি।

উদাহরণস্বরূপ, জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয়, নাইজেরিয়ার ইলোরিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডি-৮ ভুক্ত দেশগুলোর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমরা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি। এর সুফলও আমরা পেতে শুরু করেছি; ইতোমধ্যে কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক আমাদের এখানে এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।

ঢাকা পোস্ট : চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আপনারা বিশেষ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলবেন কী?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : চীনের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত করতে আমরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। আমাদের এখানে আগে থেকেই ‘কনফুসিয়াস সেন্টার’ ও ‘সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজ’ কাজ করছে, যার মাধ্যমে ভাষা ও সংস্কৃতি বিনিময়ের কার্যক্রম চলে আসছে। আমরা এখন একে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

গত বছর চীনের ইউনান প্রদেশের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেছেন। আমাদের পক্ষ থেকেও উপাচার্য মহোদয়, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং কোষাধ্যক্ষ মহোদয় চীন সফর করেছেন। এই পারস্পরিক সফরের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করা।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ও নৈতিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ / ছবি- সংগৃহীত

আমরা চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে যাক এবং চীনের শিক্ষার্থীরাও আমাদের এখানে পড়তে আসুক। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। চীন বর্তমানে ‘এআই প্লাস’ (AI+) নামক একটি বিশাল প্রকল্প পরিচালনা করছে। আমরা চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন তাদের এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী মাসেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই-বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন ‘ফোকাল পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে।

শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমাতে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার দূরত্ব কমিয়ে আনার ওপর ড. মামুন আহমেদ বিশেষ জোর দিয়েছেন। জব মার্কেটের চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাস আধুনিকায়ন এবং ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনই বর্তমান প্রশাসনের শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য। শিক্ষার্থীরা যেন কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষায় নয়, বরং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে গড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে

বাংলাদেশের জন্য ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছে। তাদের বিভিন্ন সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়েছে এবং আরও কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো—চীনের সহযোগিতায় একটি যৌথ সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা, যা আমাদের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যাল সাইন্স অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজিতে চীন অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাদের ট্র্যাডিশনাল (ঐতিহ্যগত) মেডিসিন আছে। তারা মডার্ন মেডিসিনের সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের একটা সংশ্লেষ ঘটাতে পেরেছে। আমাদেরও ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন আছে। আমরা চাই তাদের অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগিয়ে আমাদের ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে ইমপ্রুভ করতে এবং একই সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের সঙ্গে মডার্ন মেডিসিনের সংশ্লেষ ঘটাতে। 

ইতোমধ্যে ‘সাংহাই ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন’-এর দুজন অধ্যাপক আমাদের এখানে এসেছেন। তাদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় এবং ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ নিয়ে কাজ চলছে। এর মাধ্যমে আমাদের ফার্মেসি অনুষদের পাঠ্যক্রম আরও আধুনিক করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

একটি অত্যন্ত আশাবাদী খবর হলো, আমরা খুব শীঘ্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছি। চীনের ইউনান প্রদেশের ‘কুনমিং ইউনিভার্সিটি ক্যান্সার সেন্টার’-এর কারিগরি ও গবেষণা সহযোগিতায় এটি বাস্তবায়িত হবে। দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই কেন্দ্রটি বাংলাদেশে ক্যান্সার গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

ঢাকা পোস্ট : আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, আবাসন এবং ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থার উন্নয়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে আমরা বহুমাত্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রথমত, আমাদের ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেল বা আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসটিকে আধুনিকায়ন ও আরও উন্নতমানের করা হচ্ছে, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখানে এসে একটি মানসম্মত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ পান।

আমরা একটি কার্যকর ক্রেডিট ট্রান্সফার সিস্টেম (Credit Transfer System) প্রবর্তনের কাজ করছি, যা আমাদের এখানে আগে ছিল না। এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেমন বিদেশে নির্দিষ্ট মেয়াদে পড়াশোনা করে ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ পাবে, তেমনি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আমাদের এখানে এসে পড়াশোনা করে সেই ক্রেডিট তাদের নিজ দেশে স্থানান্তর করতে পারবে। আমরা আশা করছি, আগামী ‘একাডেমিক কাউন্সিল’-এই বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

এছাড়া, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ ও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সুযোগগুলো সহজে গ্রহণ করতে পারে, সেদিকেও আমরা বিশেষ নজর দিচ্ছি। আবাসন, ভর্তি প্রক্রিয়া এবং ক্রেডিট ট্রান্সফারের এই সামগ্রিক সমন্বয় যদি আমরা সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়বে।

ঢাকা পোস্ট : বিদেশি অধ্যাপকরা যাতে নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, সে বিষয়ে আপনাদের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আছে কি?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত খ্যাতিমান স্কলারদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদচারণা বৃদ্ধি পাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক (Indicator)। এটি সরাসরি প্রমাণ করে যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এবং শিক্ষায় কতটা সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন।

আমরা বিদেশি গবেষক ও অধ্যাপকদের নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরের সুবিধার্থে— সেটি স্বল্পমেয়াদে হোক বা দীর্ঘমেয়াদের—একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেছি। এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের নামকরা শিক্ষক ও গবেষকদের আমাদের ক্যাম্পাসে আসতে উৎসাহিত করা। এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেমন বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলো পাবেন, তেমনি আমাদের শিক্ষকদের সঙ্গে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান আদান-প্রদান আরও গতিশীল হবে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের বর্তমান অবস্থান কোথায় এবং কোন কোন জায়গায় আমাদের আরও উন্নয়ন প্রয়োজন।

ঢাকা পোস্ট : ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং নৈতিক শিক্ষা—এসব বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের ভাবনা কী?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তিই হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার নিবিড় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সম্পর্কের জায়গায় কিছুটা দূরত্ব বা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রশাসনের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেই সুন্দর ও শ্রদ্ধাভাজন জায়গাটিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুততার সঙ্গে এর গুণগত মানোন্নয়ন করা।

বর্তমান সময়ে সামগ্রিকভাবে নৈতিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় (Erosion) আমরা লক্ষ করছি, তা উদ্বেগের বিষয়। আমরা চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্র্যাজুয়েট কেবল শিক্ষা ও গবেষণায় সেরা হয়ে বের হবেন না, বরং তিনি যেন নৈতিকতার মানদণ্ডেও একজন অনুকরণীয় মানুষ হয়ে ওঠেন। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আমরা খুব শীঘ্রই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষার একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলব, যা প্রতিটি শিক্ষার্থীর মানবিক ও চারিত্রিক মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।

ঢাকা পোস্ট : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫৬টি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সেন্টার ভালো কাজ করলেও অনেকগুলোই স্থবির হয়ে আছে। এগুলো নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আমাদের ৫৬টি গবেষণা কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনার জন্য আমরা ইতোমধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ জরিপ বা সার্ভে সম্পন্ন করেছি। সেখানে দেখা গেছে, কিছু সেন্টার অত্যন্ত চমৎকার কাজ করছে, আবার অনেকগুলো একেবারেই অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। আমরা মনে করি, কেবল নামমাত্র কোনো গবেষণা কেন্দ্র সচল রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একটি সেন্টার মানেই সেখানে প্রকৃত অর্থে গবেষণা হতে হবে।

শিক্ষার্থীদের কেবল মেধাবী নয়, বরং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৈতিক অবক্ষয় রোধে বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী একটি নৈতিক কাঠামো গড়ার কাজ চলছে। পাশাপাশি মফস্বল থেকে আসা অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম বর্ষ থেকেই শতভাগ আর্থিক ও আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বৃত্তির পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ভেতরেই খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির চিন্তা করছে প্রশাসন

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিশেষ ব্যক্তিবর্গের নামে অনেক সেন্টার তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে সচেতন মহলে নানা বিতর্ক ও আপত্তি রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কেন্দ্র থাকতে পারে না। তাই আমরা এই সেন্টারগুলোকে নতুন করে সাজাতে (Redesign) এবং এদের কার্যক্রমকে আধুনিক ও যুগোপযোগীভাবে পুনর্গঠিত করতে ইতোমধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

ঢাকা পোস্ট : বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসনে আপনাদের ভাবনা বা প্রস্তুতি কেমন?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের পেছনে নানাবিধ কারণ কাজ করে। প্রশাসন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী—আমরা সবাই সর্বদা চেষ্টা করি একাডেমিক ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে অনুসরণ করতে। তবে অনেক সময় আমাদের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এমন কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

যেমন— জাতীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা (২০২৪-এর প্রেক্ষাপট) কিংবা কোভিডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত মহামারি। এ ধরনের পরিস্থিতির ধাক্কায় যখন আমরা পিছিয়ে পড়ি, তখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে কীভাবে অতিরিক্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই সময়টুকু ‘রিকভার’ করা যায়।

এক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, অনুষদ ভেদে সেশনজটের ধরনে ভিন্নতা থাকে। কলা অনুষদ বা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো তুলনামূলক দ্রুত সিলেবাস শেষ করতে পারলেও বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলো কিছুটা পিছিয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হলো বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে ল্যাবরেটরি এবং প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের আধিক্য। আমরা চাইলে অনলাইনে ক্লাস বা ভাইভা নিতে পারি, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল বা হাতে-কলমে শিক্ষার বিষয়গুলো অনলাইনে সম্ভব নয়। তাই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা প্রতিটি বিভাগের সমস্যা অনুযায়ী আলাদা কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করছি যাতে শিক্ষার্থীরা সেশনজটের অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।

ঢাকা পোস্ট : শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা আসলে কেমন চলছে বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আমি বর্তমান সময়ের কিছু উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করতে চাই। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সাধারণ বেকারত্বের হারের তুলনায় শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় তিন গুণ বেশি। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে—আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের চাহিদার বিস্তর ফারাক। প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষিত যুবক মনে করেন, তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করছেন, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগ নেই।

শিক্ষিত বেকারত্বের হার কমাতে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার দূরত্ব কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন ড. মামুন আহমেদ / ছবি- সংগৃহীত

সহজ কথায়, আমরা যে ধরনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি, তার সঙ্গে বর্তমান অর্থনীতি বা জব মার্কেটের চাহিদার কোনো মিল নেই। ফলে ইন্ডাস্ট্রিগুলো যেমন দক্ষ জনবল পাচ্ছে না, তেমনি শিক্ষার্থীরাও চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই দূরত্ব ঘোচাতে হলে আমাদের সিলেবাস আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে হবে। বাজারের চাহিদা বুঝে সেই অনুযায়ী ‘স্কিলড গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করাই হবে শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য।

ঢাকা পোস্ট : দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনি ব্যক্তিগতভাবে কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আমার প্রধান অগ্রাধিকার হলো শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং গবেষণাবান্ধব একটি ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা। আমি এমন একটি প্রগতিশীল ও উৎসাহমূলক পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখবেন এবং নিজেদের শিক্ষা ও গবেষণায় পুরোপুরি নিমগ্ন রাখতে পারবেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তনটুকুর ওপরই আমি সবচেয়ে বেশি মনোনিবেশ করেছি।

ঢাকা পোস্ট : শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান বা আর্থিক সংকটের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন কিছু ভাবছে?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মফস্বল থেকে আসেন। তাদের একটি বড় অংশের জন্য প্রথম বর্ষ থেকেই আর্থিক ও বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। যদি একজন শিক্ষার্থীর এই মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো যায়, তবেই সে প্রথম দিন থেকে পড়াশোনা ও গবেষণায় মনোনিবেশ করতে পারবে।

আমরা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি যেন প্রথম বর্ষের শতভাগ শিক্ষার্থীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যাদের পারিবারিক সামর্থ্য কম, তাদের জন্য আমরা পর্যাপ্ত স্কলারশিপ ও স্টাইপেন্ডের ব্যবস্থা করছি। এ ছাড়া আমাদের একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে—যাদের সরাসরি বৃত্তি দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের জন্য ক্যাম্পাসের ভেতরেই বিভিন্ন খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের (On-campus employment) সুযোগ তৈরি করা। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হবে, তেমনি কাজের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করবে, যা পরবর্তী কর্মজীবনে তাদের এগিয়ে রাখবে।

ঢাকা পোস্ট : পাঁচ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আপনি কোন অবস্থানে দেখতে চান?

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি দুটি জায়গায়। প্রথমত, আমাদের শিক্ষার্থীরা—যারা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হওয়া এ দেশের সবচেয়ে মেধাবী সন্তান। এটিই আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রায় দুই হাজার বা তারও বেশি শিক্ষক রয়েছেন, যাদের অর্ধেকেরও বেশি পিএইচডিধারী। সবচেয়ে গর্বের বিষয় হলো, আমাদের গবেষক ও শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমকক্ষ। এটি অনস্বীকার্য এক বাস্তবতা।

আমাদের এখনকার প্রধান কাজ হলো—সবাই মিলে একটি সম্মিলিত পরিবারের মতো কাজ করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। যদি আমরা ক্যাম্পাসে এই গবেষণাবান্ধব ও উৎসাহমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তবে আমাদের সাফল্য সুনিশ্চিত।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে একটি সম্মানজনক অবস্থানে যাওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা ও যোগ্যতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় দেখতে চাই। আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে নিশ্চয়ই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।

ঢাকা পোস্ট : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ : ঢাকা পোস্টকেও ধন্যবাদ।
 

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

সর্বশেষ