বগুড়াবাসীর ঝুলিতে কী কী
‘হামাকেরে ঘরের ছল ঘরে ফিরিচ্চে, তাও দ্যাশের প্রধানমন্ত্রী হয়্যা।’Ñ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত সোমবারের প্রথম বগুড়া সফরে জেলার সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল এমন অনুভূতি। ছিল শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থলে মানুষের ভিড় আর উৎসবমুখর পরিবেশ। “ঘরের ছেলে প্রধানমন্ত্রী’র কাছে বগুড়াবাসীর প্রত্যাশাও ছিল অনেক। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “এই এলাকা শহিদ জিয়ার জন্মস্থান। আপনাদের যেমন শহিদ জিয়া, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ওপর হক আছে, সারা দেশের মানুষেরও হক আছে। শুধু গাবতলী বা বাগবাড়ীতে উন্নয়ন করলে হবে? বিবেচনা করে উন্নয়ন করতে হবে। সারা দেশই উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আমি তো আছিই আপনাদের কাছে, এলাকার উন্নয়ন হবে। কিন্তু সারা দেশের প্রতি নজর দিতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশে যাওয়ার প্রবণতায় আনন্দে উদ্বেল হয়েছে বগুড়াবাসী। তা ছাড়া তাদের প্রত্যাশার ঝুলিও শূন্য নেই একেবারে।
সিটি করপোরেশন পেল বগুড়াবাসী
সফরের দিন সোমবার সকালে বগুড়ায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে ই-বেইল বন্ড কার্যক্রম উদ্বোধনের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বগুড়া পৌরসভাকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিনের এই দাবি পূরণ হওয়ায় উপস্থিত সবার মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়, করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।
১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা দেশের প্রাচীন পৌর প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সময়ের পরিক্রমায় এর পরিধি বাড়লেও সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার অপেক্ষা ছিল দীর্ঘদিনের। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী প্রস্তাবিত এই নগরের জনসংখ্যা চার লাখের বেশি। নতুন এই মর্যাদা পাওয়ার মধ্য দিয়ে বগুড়া এখন পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক নাগরিক সেবা এবং বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোবে বলে মনে করছেন নগরবাসী।
শহরের চকসূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “এটা আমাদের জন্য গর্বের দিন। অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হলো।”
গৃহিণী শিউলি বেগম বলেন, “সিটি করপোরেশন হওয়ায় আমাদের শহর আরও সুন্দর ও আধুনিক হবে বলে আমরা আশা করছি।”
একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন
দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় যেসব উন্নয়ন প্রকল্প ও কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ সকালে বগুড়া ডিস্ট্রিক্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নতুন ভবন, জেলা আদালতে ই-বেল্ট বন্ড ব্যবস্থা, শহীদ জিয়া কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম, নশিপুর এলাকায় খালখনন কার্যক্রম, সন্ধ্যায় নবনির্মিত বগুড়া প্রেস ক্লাব ভবন ও বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের সংস্কার কাজ, গাবতলীর বাগবাড়িতে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতালে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ইত্যাদি।
একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ঘোষণা : সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ার উন্নয়নে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। যেগুলোর মধ্যে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণ, বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো সুবিধা চালুর পরিকল্পনা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য দেশ-বিদেশে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বাগবাড়ি শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ সরকারীকরণের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি পিআইবির একটি শাখা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন।
নতুন আশার সঞ্চার
প্রধানমন্ত্রীর এসব ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল হাই বলেন, “যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। নতুন বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।” তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, “বগুড়া অনেক সম্ভাবনাময় জায়গা। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে শহরের গুরুত্ব আরও বাড়বে।”
বগুড়া ঘিরে রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে এই সফরে। জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান এবং দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলার উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আগে থেকেই নানা আলোচনা ছিল। অনেকেই মনে করেন, উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা হওয়া সত্ত্বেও বগুড়া তার সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের উন্নয়ন উদ্যোগের অভাব ছিল। ফলে জেলার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শহরের বাসিন্দা আসাদুল হক কাজল বলেন, “বগুড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কিন্তু আমরা সেইভাবে উন্নয়ন পাইনি। এখন নতুন করে আশা করছি।”
সোহেল রানা নামে এক তরুণ বলেন, “এই সফরের মাধ্যমে মনে হচ্ছে বগুড়ার উন্নয়নের নতুন পথ তৈরি হলো।”
আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ভাঙলেন প্রধানমন্ত্রী
দিনভর কর্মসূচির ফাঁকে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেছে এক ভিন্ন রূপে। আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। কোথাও দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন, কোথাও হাত মিলিয়েছেন জনতার সঙ্গে, আবার কোথাও গাড়ি থামিয়ে খোঁজখবর নিয়েনছে আশপাশের সবারÑ এসব দৃশ্যের অবতারণা ঘটেছে শহরের বিভিন্ন স্থানে। অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া খাতুন বলেন, “উনাকে এত কাছে থেকে দেখব ভাবিনি। খুব আন্তরিকভাবে কথা বলেছেন।”
শহরের বাসিন্দা মাসুদ রহমান বলেন, “এভাবে মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়াটা আমাদের ভালো লেগেছে। এমনকি অবাকও হয়েছি আমরা।”
দিনের শেষ ভাগে পৈতৃক ভিটা ‘জিয়া বাড়ি’ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সেখানেও ভিড় করেন স্থানীয় মানুষজন। অনেকেই তাকে একনজর দেখার জন্য অপেক্ষা করেন, কেউ কেউ কথা বলার সুযোগও পান।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বগুড়া সফরে জেলার মানুষ পেয়েছে একটি বড় প্রশাসনিক স্বীকৃতি, একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা এবং মানুষের খুব কাছে থাকা এক নেতৃত্বের উপস্থিতি। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে ঘিরে বগুড়াজুড়ে নতুন সম্ভাবনা ও আশার আবহ তৈরি হয়েছে। এখন সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছেন বগুড়াবাসী।
এ ব্যাপারে বগুড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ বলেন, “বগুড়াবাসীর যত দাবি ছিল, তার কিছু পূরণ হয়েছে। যে গতিতে দাবিসমূহ পূরণ হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে বগুড়াবাসীর দাবি করার মতন আর কিছু থাকবে না।”
বগুড়া- ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বগুড়া সফরে অনেক প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, অনেক প্রাপ্তি ঘটেছে। আমরা অনেক খুশি। তিনি বগুড়াসহ সারা দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাচ্ছেন।”
সূত্র: প্রথম আলো







.webp)






