চ্যালেঞ্জ থাকলেও সম্ভাবনায় চোখ
বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা শেষ হয়েছে। বগুড়া পৌরসভাকে রোববার সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুধু গেজেট ঘোষণার বাকি। এ নিয়ে শহরজুড়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অবকাঠামো, জনবল ও রাজস্ব– সবখানেই এখনও নতুন সিটি করপোরেশনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ থেকে সড়ক–প্রায় প্রতিটি খাতেই রয়েছে ঘাটতির চিত্র। অথচ সিটি করপোরেশন হিসেবে দায়িত্ব ও সেবার পরিধি আগের থেকে বাড়ছে কয়েক গুণ। সঙ্গে বেড়েছে নাগরিক প্রত্যাশাও। প্রস্তুতি ছাড়া এই বাড়তি চাপ সামলানোই এখন বগুড়ার নতুন সিটির সামনে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা
সিটি করপোরেশন ঘোষণার মধ্য দিয়ে বগুড়ার সামনে নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায় খুলে গেছে। এমনই মনে করছেন ব্যবসায়ী ও নগর বিশেষজ্ঞরা। বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের নেতারা বলছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রীয় অবস্থান, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক সংযোগ, কৃষি ও পাইকারি বাজারভিত্তিক অর্থনীতি এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব মিলিয়ে বগুড়া অনেক আগেই আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। সিটি করপোরেশনের মর্যাদা সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল। তাদের মতে, এখন সরকারি বড় অবকাঠামো প্রকল্প, উন্নয়ন বরাদ্দ, আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রকল্প এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগ বহু গুণ বাড়বে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন মার্কেট, শপিং কমপ্লেক্স, ফুড জোন, সার্ভিস সেন্টার, পরিবহন ব্যবসা ও ই-কমার্স ডেলিভারি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ তৌফিকুল ইসলাম বলেন, সঠিক মাস্টারপ্ল্যান করা গেলে বগুড়ায় পৃথক বাণিজ্যিক জোন, আবাসিক জোন, শিল্প জোন ও প্রশাসনিক জোন তৈরি সম্ভব। এতে যানজট কমবে, জমির ব্যবহার সুশৃঙ্খল হবে। পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়ণ ঘটবে। তিনি মনে করেন, শহরের বাইরে রিং রোড, বাইপাস, ট্রাক টার্মিনাল ও লজিস্টিক পার্ক গড়ে উঠলে বগুড়া উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনের প্রধান ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারে।
বগুড়া চেম্বারের সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, বগুড়া দই, কৃষিযন্ত্র, হালকা প্রকৌশল, সবজি, আলু, ধান, মাছ ও গবাদি পশুর বড় বাজার। সিটি করপোরেশন হওয়ায় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কোল্ডস্টোরেজ, প্যাকেজিং শিল্প, গার্মেন্ট উপখাত, হাসপাতাল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আইটি পার্ক স্থাপনের সুযোগ তৈরি হলো। এতে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান হবে।
তিনি মনে করেন, আশপাশের জেলার মানুষ উন্নত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, পাইকারি বাজার, ব্যাংকিং ও দ্রুত পরিবহন সুবিধা পাবেন। কৃষকরা সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। ব্যবসায়ীরা কম খরচে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। ফলে বগুড়া সিটি করপোরেশন শুধু শহরের উন্নয়ন নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করার বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
বগুড়া পৌর এলাকায় দিনে ১২০-১৩০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে সংগ্রহ করা যায় সর্বোচ্চ ৭০-৮০ টন। বাকি বর্জ্য খোলা ড্রেন, খাল ও সড়কে পড়ে থাকে। আধুনিক ল্যান্ডফিল বা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্লান্ট না থাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিনের।
ড্রেনেজ ব্যবস্থারও একই চিত্র। মোট ১২১০ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে ৭৭০ কিলোমিটার কাঁচা, ভাঙা বা অবরুদ্ধ। সড়ক অবকাঠামোতেও ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ১৩৪০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৩৬৫ কিলোমিটার এখনও কাঁচা বা আধাপাকা। অনেক ওয়ার্ডেই উন্নত সড়ক নেই।
বর্ধিত এলাকায় দীর্ঘ বঞ্চনা
১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভার আয়তন ২০০৬ সালে ১৪ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৭০ বর্গকিলোমিটার করা হয়। তখন সদর ও শাজাহানপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন এবং ছয়টি ইউনিয়নের অংশ যুক্ত করা হয়। ওয়ার্ড ১২টি থেকে বেড়ে হয় ২১টি। বর্তমানে নাগরিক প্রায় সাড়ে সাত লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বাস ১ থেকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডে। বাকি তিন লাখ বাস করেন বর্ধিত ১৩ থেকে ২১ নম্বর ওয়ার্ডে।
বাস্তবে এই এলাকাগুলোর বড় অংশ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। মোট সড়কের ২৫ শতাংশ এখনও কাঁচা। অন্তত ৫৫ শতাংশ এলাকায় নেই সড়কবাতি।
ফাঁপোর এলাকার আকবর আলী বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে থাকলে কম কর দিয়ে কিছু উন্নয়ন পেতাম। এখন চারগুণ কর দিচ্ছি, কিন্তু সুবিধা পাইনি।’ তবে সিটি করপোরেশন হওয়ায় এবার পরিবর্তন হবে বলে আশাবাদী তিনি।

প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ
পৌরসভার প্রকৌশল শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৬১০ কিলোমিটার সড়ক পাকা ও আরসিসি করা। বাকি ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক পুরো কাঁচা। আর ৩৪০ কিলোমিটার ইট বিছানো। এগুলোর বেশির ভাগই বর্ধিত এলাকায়।
নতুন ঘোষিত সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন হওয়ায় বরাদ্দ বাড়বে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৭১ কোটি টাকার বাজেট থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ৪০২ কোটি ১৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। এখনও অবকাঠামো উন্নয়নে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
দেড়শ বছরের পুরোনো এই পৌরসভার কোনো মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, শহরে তীব্র যানজটের সমস্যা আছে। এটি সমাধানে বুয়েটের একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের বলছেন, নতুন সিটি করপোরেশনের প্রথম বছরটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস, জনবল নিয়োগ, মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত এবং জরুরি অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু করতে হবে।
পুনর্বিন্যাস ও রাজস্ব চাপের চ্যালেঞ্জ
সিটি করপোরেশন গঠনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও রাজস্ব ঘাটতির দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে ইউনিয়ন এলাকা অন্তর্ভুক্তি, সম্পদ হস্তান্তর ও দায়িত্ব বণ্টনের মতো কাঠামোগত পরিবর্তন, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে প্রয়োজনীয় রাজস্ব জোগানের চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন। এলাকা অন্তর্ভুক্ত হলে উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ একাধিক সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি ও সমন্বয় করতে হবে। এতে করে দ্বৈত কর্তৃত্ব, ফাইল জট ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ তৌফিকুল ইসলামের ভাষ্য, বর্তমানে বগুড়ার বার্ষিক আয় প্রায় ৮০ থেকে ৮৮ কোটি টাকা। অথচ একটি কার্যকর সিটি করপোরেশন পরিচালনায় প্রয়োজন অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা। এই ব্যবধান পূরণে কর বৃদ্ধি প্রায় অনিবার্য। হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য সেবার ফি বাড়াতে হতে পারে। এটি সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
বগুড়া পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব থাকা রাজিয়া সুলতানা বলেন, সিটি করপোরেশন হলেও রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন সম্ভব নয়। আস্তে আস্তে এর কর্মপরিধি ও নাগরিক সেবাগুলো বিস্তৃত হবে।
সূত্র: প্রথম আলো







.webp)






