বুধবার   ২৫ মার্চ ২০২৬ || ১০ চৈত্র ১৪৩২

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১০:৩০, ২৪ মার্চ ২০২৬

হাইকোর্টে অর্ধশত আসনের ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ, যে প্রক্রিয়ায় এগোবে বিচার

হাইকোর্টে অর্ধশত আসনের ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ, যে প্রক্রিয়ায় এগোবে বিচার
সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা করেছেন প্রায় অর্ধশত পরাজিত প্রার্থী। মামলার বাদী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী এম এ কাইয়ুম এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা। 

আদালত এসব মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ করে ইতোমধ্যে বিবাদীদের প্রতি নোটিশ ইস্যু করেছেন। পাশাপাশি চ্যালেঞ্জ করা আসনগুলোর ব্যালট পেপার ও রেজাল্ট শিট নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলেকশন পিটিশন মামলাগুলো মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির। এখানে ‘কোড অব সিভিল প্রসিডিউর’ বা দেওয়ানি কার্যবিধি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। খুব ধীর প্রক্রিয়ায় এসব মামলার বিচার কার্যক্রম চলে। ফলে চলতি সংসদের মেয়াদকালে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

যে প্রক্রিয়ায় এগোবে বিচার

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই মামলাগুলো সম্পর্কে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ভালো নয়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার এত বিলম্বিত হয় যে, একটা পর্যায়ে প্রার্থী আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নির্বাচন থেকে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত সময় শুধু মামলা নিষ্পত্তিতেই লেগে যায়। এ কারণে অনেকে মনে করেন, এসব মামলার সাকসেস রেট (সাফল্যের হার) কম হওয়ায় এগুলোর কোনো অর্থ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে এটি তিন স্তরবিশিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ছিল, যা এখন দুই স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, মামলাগুলো সরাসরি হাইকোর্টে দায়ের করতে হবে এবং হাইকোর্টের রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাবেন। এই মামলাগুলো নিষ্পত্তির মূল তাগিদ থাকে বাদীর ওপর। বাদী এবং তার নিয়োগকৃত আইনজীবী কতটা সক্রিয়ভাবে মামলা পরিচালনা করবেন এবং কত দ্রুত সাক্ষ্য উপস্থাপন করবেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে।’

‘অন্যদিকে, যিনি ইতোমধ্যে এমপি হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন, তার চেষ্টা থাকবে মামলাটি বিলম্বিত করার। হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতেই কেউ সরাসরি পার্লামেন্টে গিয়ে বসবেন– এমনটি মনে করার কারণ নেই। কারণ যিনি সংক্ষুব্ধ হবেন, তিনি অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন এবং সেটিও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এসব মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে শুধু আইনজীবীদের চেষ্টা থাকলেই হবে না; বেঞ্চ গঠন এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতিরও ভূমিকা রয়েছে’, বলেন রুহুল কুদ্দুস কাজল।

আরেক আইন বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি এই মামলাগুলো খুব ধীরগতিতে এগোয়। একটি দেওয়ানি মামলা যেভাবে পরিচালিত হয়, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোও একই পদ্ধতিতে চলে। মামলা ফাইল ও গ্রহণের পর নোটিশ যায়, অপরপক্ষ আসে, ইস্যু ফ্রেম হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ আসে, জেরা ও যুক্তিতর্ক হয়, ডকুমেন্টগুলো এক্সিবিট হয় এবং সবশেষে রায় হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে যায়। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দুই-একটি মামলায় সফলতা এলেও সেটি এমন সময় আসে যখন পার্লামেন্টের মেয়াদই থাকে না।’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘এসব দীর্ঘসূত্রতা থেকে বাঁচতে হলে একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। প্রতিদিন ট্রাইব্যুনাল বসতে হবে এবং একটি মামলা ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করে আরেকটিতে যেতে হবে। একটি ট্রাইব্যুনালের পক্ষে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও অর্ধশতাধিক পিটিশন সুরাহা করা সম্ভব নয়। ট্রাইব্যুনালগুলোকে এই কাজ ছাড়া অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া যাবে না; এটাই এখানে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা।’

একই মত প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি বা আইন ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে যেকোনো প্রার্থী হাইকোর্ট বিভাগে ইলেকশন পিটিশন দায়ের করতে পারেন। এতে জয়ী প্রার্থীর গেজেট বাতিল বা পুনঃনির্বাচন চাওয়া হয়; অনেক ক্ষেত্রে ভোট পুনর্গণনার আবেদনও থাকে। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ ইতোমধ্যে দরখাস্তগুলো গ্রহণ (অ্যাডমিট) করে নোটিশ জারি করেছেন এবং ব্যালট পেপার ও ফলাফল শিট নির্বাচন কমিশনের হেফাজতে নিতে বলেছেন, যাতে পরবর্তীতে আদালত পুনর্গণনার আদেশ দিলে তা কার্যকর করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মামলাগুলো দেওয়ানি প্রকৃতির হওয়ায় দেওয়ানি কার্যবিধি এবং আরপিও গাইডলাইনস অনুসরণ করা হয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় একটি সংসদের মেয়াদ চলাকালীন জাতীয় নির্বাচনের ইলেকশন পিটিশন নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা একদমই নেই বললে চলে। অতীতে এমন নজিরও খুব একটা নেই। হাইকোর্ট বিভাগ রায় দিলেও তার বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকায় নির্বাচন কমিশন তা দ্রুত কার্যকর করতে পারে না। তবে রিটকারীরা দ্রুত নিষ্পত্তি চাইলে আদালতে আবেদন করতে পারেন এবং আদালত গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।’

হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যত মামলা

ভোটে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন প্রায় অর্ধশত প্রার্থী। আরও অনেক প্রার্থী মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিজ নিজ আসনের ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছেন বিএনপির ২৬ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২০ জন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও এলডিপির একজন করে প্রার্থী।

মামলা দায়েরকারী প্রার্থীদের তালিকা

বিএনপি (২৬ জন) : মাদারীপুর-১ আসনের নাদিরা আক্তার, নীলফামারী-২ শাহরিন ইসলাম, চুয়াডাঙ্গা-১ মো. শরীফুজ্জামান, ঢাকা-১১ এম এ কাইয়ুম, কুষ্টিয়া-৪ সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, ঢাকা-৫ মো. নবী উল্লাহ, গাইবান্ধা-৫ মো. ফারুক আলম, পাবনা-৩ মো. হাসান জাফির তুহিন, সিরাজগঞ্জ-৪ আকবর আলী, কুমিল্লা-১১ কামরুল হুদা, ঢাকা-৪ তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা-১৬ আমিনুল হক, ময়মনসিংহ-১ সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স, কুড়িগ্রাম-২ সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, রংপুর-৬ সাইফুল ইসলাম, রংপুর-৪ এমদাদুল হক ভরসা, রাজশাহী-১ মে. জে. (অব.) মো. শরীফউদ্দিন, রাজশাহী-৪ ডিএমডি জিয়াউর রহমান, পাবনা-৪ হাবিবুর রহমান হাবিব, শেরপুর-১ সানসিলা জেবরিন, ময়মনসিংহ-২ মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং ময়মনসিংহ-৬ আসনের মো. আখতারুল আলমসহ অন্যরা।

জামায়াতে ইসলামী (২০ জন) : খুলনা-৫ আসনে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, কক্সবাজার মহেশখালীতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, পিরোজপুর-২ শামীম সাঈদী, বরগুনা-২ ডা. সুলতান আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জ-২ ইলিয়াছ মোল্লা, নারায়ণগঞ্জ-৩ ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া, লালমনিরহাট-১ আনোয়ারুল ইসলাম রাজু, লালমনিরহাট-২ ফিরোজ হায়দার, ঢাকা-৬ আব্দুল মান্নান, গাইবান্ধা-৪ মো. আব্দুর রহিম সরকার, ঢাকা-৭ মো. এনায়েতউল্লাহ, কক্সবাজার-৪ নূর আহম্মেদ আনোয়ারী এবং ঢাকা-১০ আসনে জসিমউদ্দিন সরকারসহ অন্যরা।

অন্যান্য দল: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক ঢাকা-১৩ আসনে এবং চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপির প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদের পক্ষে তার ছেলে ওমর ফারুক মামলা করেছেন। এছাড়া ময়মনসিংহ-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থীও ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।

প্রসঙ্গত, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৪৯ ধারা অনুযায়ী নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনী’ আবেদনপত্র শুনানির জন্য হাইকোর্টে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বাধীন একক বেঞ্চ এসব আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ করছেন।

এমএইচডি/বিআরইউ

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট