সাত পাহাড়ের মুকুট বলা হয় যে মসজিদকে
তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের ফাতিহ জেলায় ঐতিহাসিক নগরপ্রাচীরের পাশে অবস্থিত এদিরনেকাপি মিহরিমাহ সুলতান মসজিদ। প্রখ্যাত অটোমান স্থপতি মিমার সিনানের নকশায় নির্মিত এই মসজিদ প্রাকৃতিক আলো ও অনন্য স্থাপত্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
অটোমান সুলতান সুলায়মান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের কন্যা মিহরিমাহ সুলতানের উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। মিমার সিনানের নকশায় ১৫৬৩ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৫৬৬ সালে তা সম্পন্ন হয়। নির্মাণের পর থেকেই এটি নিয়মিত ইবাদতের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইস্তাম্বুলের সাতটি পাহাড়ের একটির ওপর উঁচু জায়গায় মসজিদটি নির্মিত। ফলে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে এটি সহজেই চোখে পড়ে। ইস্তাম্বুলের আকাশরেখায় এর একটি বিশেষ স্থান তৈরি হয়েছে।
মসজিদটির নামাজঘর প্রশস্ত এবং একটি বড় গম্বুজের নিচে অবস্থিত। খিলানভিত্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই গম্বুজ অটোমান ধ্রুপদি স্থাপত্যের একটি দৃষ্টিনন্দন উদাহরণ। নামাজঘরের দেয়ালে অসংখ্য জানালা রয়েছে, যার মাধ্যমে ভেতরে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করে।
মসজিদের অভ্যন্তরে মার্বেলের কারুকাজ ও সূক্ষ্ম অলংকরণ এর শিল্পমূল্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মসজিদটিতে একটি মাত্র মিনার রয়েছে। এই কমপ্লেক্সে মাদরাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, সমাধি, হাম্মাম এবং বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং অবস্থানের কারণে এই মসজিদকে ইস্তাম্বুলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে আলো ও স্থান ব্যবহারে মিমার সিনানের দক্ষতারও একটি অনন্য উদাহরণ এটি।
ইস্তাম্বুল মেডেনিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের তুর্কি-ইসলামিক শিল্প ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. বেলকিস দোগান বলেন, মসজিদটিতে নির্মাণসংক্রান্ত কোনো শিলালিপি না থাকলেও ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মিহরিমাহ সুলতানের জন্য এটি নির্মাণ করেছিলেন মিমার সিনান। তিনি মূলত সুলতান সুলায়মান ও তার পরিবারের জন্যই তার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যকর্মগুলো নির্মাণ করেছিলেন।
তিনি জানান, ইস্তাম্বুলে মিহরিমাহ সুলতানের নামে দুটি মসজিদ রয়েছে। অন্য সুলতানারা সাধারণত রাজধানীর বাইরে স্থাপনা নির্মাণ করলেও মিহরিমাহ সুলতানের নামে রাজধানী শহরেই দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে, যা তাকে বিশেষভাবে আলাদা করে তুলে।
মসজিদের অবস্থান ও নকশা প্রসঙ্গে ড. দোগান বলেন, নগরপ্রাচীরের ভেতরে ইস্তাম্বুলের সাত পাহাড়ের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্থানে এটি নির্মিত হয়েছে। ফলে শহরের প্রায় সব দিক থেকেই এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এটি মিমার সিনানের পরবর্তী শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকর্মগুলোর পূর্বসূরি হিসেবেও বিবেচিত হয়।
মসজিদের প্রধান নামাজঘর বর্গাকার হলেও পাশের অংশগুলোতে তিনটি করে ছোট গম্বুজ যুক্ত করে সিনান এটিকে আয়তাকার রূপ দিয়েছেন। প্রায় ২০ মিটার বিস্তৃত প্রধান গম্বুজটি সে সময়ের জন্য বেশ বড় এবং স্থাপত্যগত দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি সাহসী উদ্যোগ।
ড. দোগান বলেন, উস্কুদারে অবস্থিত মিহরিমাহ সুলতান মসজিদের তুলনায় এদিরনেকাপির মসজিদটি অনেক বেশি উজ্জ্বল ও প্রশস্ত মনে হয়। মূল গম্বুজের সহায়ক দেয়ালগুলোতে অসংখ্য জানালা থাকার কারণেই ভেতরে এত বেশি আলো প্রবেশ করে। সে সময়ের স্থাপত্যে এটি ছিল এক ধরনের পরীক্ষামূলক ও সাহসী প্রয়াস।
অটোমান স্থাপত্যরীতির মতো এই মসজিদও একটি বড় কুল্লিয়ের অংশ। মসজিদকে কেন্দ্র করে এর আঙিনায় একটি মাদরাসা রয়েছে। পাশাপাশি এখানে একটি ছোট বাজার ও কার্যকর একটি হাম্মামও রয়েছে। মসজিদের ভেতরে থাকা সমাধিটি মিহরিমাহ সুলতানের নয়; এটি তার কন্যা আয়শে সুলতানের স্বামী সেমিজ আহমেদ পাশার।
ড. দোগান জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের অনেক মূল অলংকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৭৬৬ সালের ভূমিকম্পে আঁকা অলংকরণের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ধ্রুপদি অটোমান স্থাপনায় সাধারণত যে টাইলসের কারুকাজ দেখা যায়, এই মসজিদে তা তুলনামূলকভাবে কম।
প্রখ্যাত পর্যটক ও ইতিহাসবিদ এভলিয়া চেলেবির ভ্রমণকাহিনিতেও মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে। তিনি মসজিদের মিহরাব, মিম্বর ও মাহফিলের অলংকরণকে অত্যন্ত শিল্পসম্মত বলে বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে অন্যান্য সাম্রাজ্যিক মসজিদের মধ্যে রাজপ্রাসাদের মতো মর্যাদাসম্পন্ন স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ড. দোগান বলেন, ইস্তাম্বুলে মিহরিমাহ সুলতানের নামে দুটি মসজিদ থাকায় এ নিয়ে নানা লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, উস্কুদারের মসজিদটি তুলনামূলক অন্ধকার হওয়ায় মিহরিমাহ সুলতান আরও আলোকোজ্জ্বল ও প্রশস্ত একটি মসজিদ নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেই চাহিদা পূরণ করতেই পরে মিমার সিনান এদিরনেকাপিতে এই মসজিদ নির্মাণ করেন।
এনটি
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

















