সোমবার   ০১ জুন ২০২৬ || ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১১:৫৩, ১ জুন ২০২৬

শীতল পাটির গ্রাম আজ অস্তিত্ব সংকটে, ঐতিহ্য আঁকড়ে টিকে ৮০ পরিবার

শীতল পাটির গ্রাম আজ অস্তিত্ব সংকটে, ঐতিহ্য আঁকড়ে টিকে ৮০ পরিবার
সংগৃহীত

বানার নদীর পাড়ঘেঁষা ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও গাজীপুরের শ্রীপুর সীমান্তের কুরচাই ও চাকুয়া গ্রাম একসময় পরিচিত ছিল ‘শীতল পাটির গ্রাম’ হিসেবে। শত শত পরিবারের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে ছিল এই ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের সঙ্গে। তবে আধুনিকতার প্রভাব, প্লাস্টিক পণ্যের প্রসার এবং কাঁচামালের সংকটে একসময় জমজমাট এই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। হাজারের বেশি পরিবারের জায়গায় বর্তমানে মাত্র ৭০-৮০টি পরিবার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে শীতল পাটি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সরজমিনে চাকুয়া গ্রামের গোপাল চন্দ্র দের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বারান্দায় বসে কয়েকজন নারী পাটি বুনছেন। তাদের হাতের ছন্দে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে নানা নকশা। পাশে পুরুষেরা মুর্তা থেকে বেত তুলে দিচ্ছেন। সবাই যেন একসঙ্গে মিলে তৈরি করছেন একটি ঐতিহ্য।

সত্তর বছর বয়সী গোপাল চন্দ্র দে তখন পাটির জন্য বেত প্রস্তুত করছিলেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তার হাত এখনো সমান দক্ষ।

তিনি বলেন, বাগান থেকে মুর্তা সংগ্রহ করার পর অল্প শুকিয়ে একেকটি গাছ তিন ফালি করে কাটা হয়। ফালির প্রথম অংশ ‘নাল’ বলে পরিচিত। এটি দিয়ে বোনা হয় পাটি। আগে দিনে একটি পাটি বানাতে পারলেও চাহিদা কমে যাওয়ায় কাজের গতিও কম। সাধারণত বেতের পাটি, বোকা পাটি এবং নামাজের পাটি বানানো হয় এখানে। নামাজের পাটি ছাড়াও বিছানার জন্য সাড়ে ৩ হাত, ও সাড়ে ৪ হাত এবং ৪-৫ হাত আকারের পাটি বানানো হয়। বিছানার পাটি মান ও আকার বেঁধে ১২শ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। স্থানীয় ও আশপাশের বাজার ও গ্রামে ফেরি করে পুরুষেরা এই পাটি বিক্রি করেন। আগে গ্রামে এসে পাইকারেরা অগ্রিম টাকা দিয়ে পাটি নিলেও এখন তা নেই।

কুরচাই ও চাকুয়ার অধিকাংশ পরিবারের মতো এখানেও শীতল পাটি শুধু একটি পণ্য নয়, জীবিকার অবলম্বন।পরিবারের নারী সদস্যরাই মূলত পাটি বোনেন। পুরুষেরা কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের কাজ করেন। শিশুদেরও অনেক সময় দেখা যায় পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতে।

গ্রামের বিভিন্ন জমিতে রয়েছে মুর্তার বাগান। সেখান থেকে মুর্তা সংগ্রহ করে শুকিয়ে, ছাল ছাড়িয়ে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রং করে তৈরি করা হয় পাটি। একবার মুর্তা লাগালে দীর্ঘদিন ধরে সেখান থেকে কাঁচামাল পাওয়া যায়। কিন্তু কাঁচামাল থাকলেও এখন নেই আগের মতো বাজার।

শীতল পাটি বুনে সংসার চালান বুলবুলি রানী সরকার। তার স্বামী কৃষিকাজ করেন। পাটি বুননের আয় দিয়েই তিনি এক ছেলেকে অনার্সে এবং মেয়েকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াচ্ছেন।

বুলবুলি রানী সরকার বলেন, পাটি বাজারে ও গ্রামে নিয়ে গেলে তেমন বিক্রি হয় না। কারেন্ট এসে পড়ায় এবং প্লাস্টিকের পাটি বের হওয়ায় আমাদের পাটির বিক্রি কমে গছে। তাই আমাদের চলতে কষ্ট হচ্ছে। পাটি বিক্রি করেই আমাদের খাওয়া দাওয়া ও পোলাপানের লেখা পড়ার খরচ যোগাতে হয়। পাটি বিক্রি না হলে পেশা বদলাতে হবে।

একই চিত্র স্বরস্বতী সূত্রধরের সংসারেও। সংসারের কাজের ফাঁকে তিনি শীতল পাটি বুনেন। স্বামী পরিমল সূত্রধর কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাদের সংসার।

স্বরস্বতী সূত্রধর বলেন, একটা পাটি বুনতে অনেক পরিশ্রম হয়। সারাদিন অন্য কোনো কাজ না করলে দিনে একটি পাটি বোনা যায়। কিন্তু আমরা সংসারের কাজের ফাঁকে এই কাজ করি। পাটি বুনে ছেলে-মেয়ের পড়ার খরচ ও সংসারের খরচ যোগান দিতে হয়। আগে অনেক পাটি বিক্রি হলেও এখন চাহিদা অনেক কম।

প্লাস্টিকের পাটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার বেদনা ফুটে ওঠে যমুনা রানী দের কণ্ঠেও।

তিনি বলেন, প্লাস্টিকের পাটির কারণেই আজ আমাদের এই অবস্থা। পাটির কাজ করলে অনেক পুঁজি লাগে। আমাদের পুঁজির সংকট থাকায় কাজটা দিন দিন কমে যাচ্ছে। যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে ঠিকমতো পারিশ্রমিক বা মূল্য না পাওয়া গেলে আগ্রহ হারিয়ে যায়। শীতল পাটির চাহিদা বাজারে কম থাকায় এখন এই শিল্প নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আমাদের টিকে থাকতে হচ্ছে খুব কষ্ট করে।

শীতল পাটি বুনন শিল্পী সমিতির সভাপতি উজ্জ্বল চন্দ্র দে মনে করেন, যথাযথ সহায়তা পেলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রতিকূলতার মধ্যেও পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। যারা এখনো এই পেশায় জড়িত রয়েছেন, তাদের টিকিয়ে রাখতে ঋণ সহয়তা ও পাটি শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ও পাটির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, আগের তুলনায় বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। আগে যে পরিমাণ পাটি বিক্রি হতো তা অনেক কমে গেছে। প্লাস্টিকের পাটি বাজারে আসায় আমাদের চাপে ফেলেছে। বর্তমান সরকার ও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ঋণ সহয়তা ও পাটি শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে পাটি দিয়ে অন্য কোনো পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া বাজারজাত করণ ও বিদেশে রপ্তানি করার মতো যদি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে আমরা দাঁড়িয়ে যাব। সরকার যদি একটু সদয় হয় তাহলে এই পেশা পাল্টাতে হবে না।

শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ-আল-মামুন। তিনি বলেন, এই শিল্পটাকে টিকেয়ে রাখতে আমরা নানাভাবে তাদের প্রমোট করছি। তাদের ঋণ সহায়তা প্রয়োজন হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে। আমরা চাই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি টিকে থাকুক।

বানার নদীর পাড়ের এই গ্রাম দুটিতে এখনও প্রতিদিন বোনা হয় কিছু শীতল পাটি। প্রতিটি পাটির ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর শত বছরের ঐতিহ্য। কিন্তু পর্যাপ্ত সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন উদ্যোগ ছাড়া হয়তো একদিন হারিয়ে যেতে পারে এই শিল্পের শেষ চিহ্নটুকুও।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

অনলাইন জরিপ

সোমবার   ০১ জুন ২০২৬ || ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১৭৩জন