শেয়ারবাজারে বেমেয়াদি ফান্ডের লেনদেনে নতুন প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে
দেশের শেয়ারবাজারে প্রথমবারের মতো ওপেন-এন্ড (বেমেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচার জন্য আলাদা ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বর্তমানে ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিট স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে লেনদেন হলেও বেমেয়াদি ফান্ডে সেই সুযোগ নেই। এই শ্রেণির ইউনিটধারীদের সরাসরি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির (এএমসি) সঙ্গে যোগাযোগ করে ইউনিট কেনাবেচা করতে হয়। এতে সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পড়তে হয় তাদের।
জানা গেছে, নতুন এই প্ল্যাটফর্ম চালু হলে খুচরা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে কম্পিউটার ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট সরাসরি কিনতে ও বিক্রি করতে পারবেন। এতে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করেই নতুন ইউনিট ক্রয় বা বিক্রি করা যাবে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ক্রয় করা ইউনিট কিংবা বিক্রির অর্থ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। বর্তমানে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কিনতে বা বিক্রি করতে তিন থেকে চার দিন অপেক্ষা করতে হয় বিনিয়োগকারীকে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত মেয়াদি ফান্ডগুলোর ইউনিট একজন বিনিয়োগকারীর থেকে অন্য আরেকজন বিনিয়োগকারীও কিনতে পারেন। কিন্তু বেমেয়াদি ফান্ডের ইউনিট কিনতে হয় সরাসরি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি থেকে। তৃতীয় কোনো পক্ষ থেকে এই ইউনিট কেনার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী যখন সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির কাছে টাকা দেয়, তখন সম্পদ ব্যবস্থাপক ওই অর্থের বিপরীতে নতুন ইউনিট তৈরি (ক্রিয়েশন) করে সেগুলোর মালিকানা অর্থদাতাকে বুঝয়ে দেন।
দেশের শেয়ারবাজারে প্রথমবারের মতো বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচায় আলাদা ওয়েব প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএসই। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে সরাসরি অনলাইনে ইউনিট কেনাবেচা করতে পারবেন। এতে সম্পদ ব্যবস্থাপকের কাছে না গিয়েই মাত্র এক কার্যদিবসের মধ্যে বিও হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি সম্ভব হবে
নতুন এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি হলে নতুন ইউনিট তৈরি ও টাকার লেনদেন— সবটাই ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে অনলাইনে কার্যকর হবে। এছাড়া, কেউ যদি তার বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিতে চান, সেক্ষেত্রে ইউনিট সংখ্যা কমানোর (রিডেম্পশন বা অবসায়ন) প্রক্রিয়াও অনলাইনে কার্যকর হবে। এক্ষেত্রে টি-১ বা এক কার্যদিবসের ব্যবধানে ইউনিটহোল্ডারকে তার ইউনিট বিক্রির অর্থ বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া হবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেমেয়াদি ফান্ডের অনলাইন লেনদেন প্রক্রিয়াও প্রকৃত সম্পদমূল্যের ওপর নির্ভর থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএসই’র নতুন এই প্ল্যাটফর্ম চালু হলে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। এতে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি ও ইউনিটহোল্ডার— উভয়ের জন্যই সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমে আসবে। ফান্ডের ইউনিট কেনাবেচায় সরাসরি সম্পদ ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হবে না। ফলে শেয়ারবাজারে যেভাবে ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে খুব সহজেই শেয়ার লেনদেন করা যায়, একই প্রক্রিয়ায় বেমেয়াদি ফান্ডগুলোর ইউনিটও কেনাবেচা করা যাবে।
এ বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, বেমেয়াদি ফান্ডগুলো যদি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে শেয়ার ও ইউনিটগুলোর মতো এগুলোও দ্রুত সেটেলমেন্ট হবে। তখন ইউনিটহোল্ডারদের আর আমাদের কাছে এসে আবেদন ফরমও জমা দিতে হবে না। নতুন ইউনিট তৈরি ও অর্থের লেনদেনও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। এটি যদি টি-ওয়ান সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়ায় কার্যকর হয়, তাহলে এক দিনের ব্যবধানেই বিনিয়োগকারী বিওতে ইউনিট অথবা টাকা জমা হয়ে যাবে। এখন যেটি নিষ্পত্তি হতে অনেক ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ দিনও লেগে যায়।
নতুন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি চালু হলে বেমেয়াদি ফান্ডের লেনদেনে সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। বর্তমানে প্রায় ১০৪টি বেমেয়াদি ফান্ড থাকলেও সরাসরি লেনদেনের সুযোগ না থাকায় বিনিয়োগকারীদের তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ৩০ জুনের মধ্যে এটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে, যা শেয়ারবাজারের অবকাঠামো আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখবে
লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ হলে বেমেয়াদি ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে বলেও মনে করেন এই সম্পদ ব্যবস্থাপক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেয়াদি ফান্ডগুলো অবসায়নে গেলে অনেক ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) অনুযায়ী টাকা ফেরত পায় না। কিন্তু বেমেয়াদি ফান্ডে বিনিয়োগ করলে অবশ্যই এনএভিতে ফেরত পাবেন, এর ব্যত্যয় কখনও ঘটেনি।
ডিএসই’র তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই প্ল্যাটফর্মটি স্টক এক্সচেঞ্জের বিকল্প লেনদেন বোর্ডের (এটিবি) সঙ্গেও যুক্ত থাকবে। পাশাপাশি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), কাস্টডিয়ান এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্ল্যাটফর্মটি কাজ করবে। এতে বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের নতুন ইউনিট তৈরি ও অবসায়ন প্রক্রিয়া সহজ হবে।
মূলত বেমেয়াদি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের নতুন ইউনিট তৈরি ও অবসায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে গত বছরের আগস্টে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে কমিশনের (বিএসইসি) কাছে একটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরির অনুমোদন চেয়ে আবেদন জানায় ডিএসই। এক্সচেঞ্জটির চিঠিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজারের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, পরিচালনাগত অদক্ষতা কমানো, ঝুঁকি হ্রাস এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বেমেয়াদি ফান্ডগুলো যদি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে শেয়ার ও ইউনিটগুলোর মতো এগুলোও দ্রুত সেটেলমেন্ট হবে। তখন ইউনিটহোল্ডারদের আর আমাদের কাছে এসে আবেদন ফরমও জমা দিতে হবে না। নতুন ইউনিট তৈরি ও অর্থের লেনদেনও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। এটি যদি টি-ওয়ান সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়ায় কার্যকর হয়, তাহলে এক দিনের ব্যবধানেই বিনিয়োগকারী বিওতে ইউনিট অথবা টাকা জমা হয়ে যাবেশান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ডিএসইকে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। অনুমোদন পাওয়ার পর এরই মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জটির পক্ষ থেকে সফটওয়্যার কোম্পানির উদ্দেশ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। নির্ধারিত সফটওয়্যার কোম্পানির থেকে সফটওয়্যার উন্নয়ন, সরবরাহ, বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা গ্রহণে চুক্তিবদ্ধ হবে ডিএসই। এক্ষেত্রে আগ্রহী সফটওয়্যার কোম্পানি ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেটরদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য সমষ্টিগত বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার লক্ষ্যে প্ল্যাটফর্মটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি চালু করতে পারব। অবশ্য প্ল্যাটফর্ম চালুর আগে বিনিয়োগকারীদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচিও নেওয়া হবে, যাতে প্ল্যাটফর্মটির সুফল তারা আগে থেকেই বুঝতে পারেন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য সমষ্টিগত বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার লক্ষ্যে প্ল্যাটফর্মটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি চালু করতে পারব। অবশ্য প্ল্যাটফর্ম চালুর আগে বিনিয়োগকারীদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মসূচিও নেওয়া হবে, যাতে প্ল্যাটফর্মটির সুফল তারা আগে থেকেই বুঝতে পারেনডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে অনুমোদিত মিউচুয়াল ফান্ডের সংখ্যা ১৪০টি। এর মধ্যে ৩৬টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে, যেগুলো ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারে লেনদেন হচ্ছে। মেয়াদি ফান্ডগুলোর সমন্বিত বাজারমূল্য প্রায় চার হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অন্যদিকে, বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে ১০৪টি, যেগুলোর সমন্বিত সম্পদমূল্য প্রায় আট হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা।
এদিকে, সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, নতুন করে মেয়াদি ফান্ডের অনুমোদন বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া, তালিকাভুক্ত কোনো মেয়াদি ফান্ডের ইউনিটদর যদি প্রকৃত সম্পদমূল্য বা এনএভি’র চেয়ে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, তাহলে সেটি অবসায়িত বা বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তর হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে বিএসইসি’র নির্দেশনায়। এরই মধ্যে ৩৬টি মেয়াদি ফান্ডের মধ্যে দুটি বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে মেয়াদি ফান্ডের বিলুপ্তি ও বেমেয়াদি ফান্ডের সংখ্যা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এই প্ল্যাটফর্ম বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় বেমেয়াদি ফান্ডের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম করার বিধান রাখা হয়েছে। যেসব মেয়াদি ফান্ড বেমেয়াদিতে রূপান্তর হবে সেগুলোও এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হবে। অনলাইন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন ফান্ডগুলোর আকার বাড়বে বা কমবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর আগ্রহ থাকলে টাকা দিয়ে নতুন ইউনিট বাড়াবে। আর আগ্রহ না থাকলে টাকা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিট সংখ্যাও কমে যাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন প্ল্যাটফর্মে ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবেবিএসইসি’র পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম
এ বিষয়ে বিএসইসি’র পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সংশোধিত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় বেমেয়াদি ফান্ডের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম করার বিধান রাখা হয়েছে। যেসব মেয়াদি ফান্ড বেমেয়াদিতে রূপান্তর হবে সেগুলোও এই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন হবে। অনলাইন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিদিন ফান্ডগুলোর আকার বাড়বে বা কমবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর আগ্রহ থাকলে টাকা দিয়ে নতুন ইউনিট বাড়াবে। আর আগ্রহ না থাকলে টাকা তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিট সংখ্যাও কমে যাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন প্ল্যাটফর্মে ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে।’
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

.webp)





.webp)




.webp)




