জ্বালানি সংকট, মব জাস্টিস ও জননিরাপত্তা নিয়ে সংসদে উত্তাপ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের প্রধান দুই চালিকাশক্তি রপ্তানি বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর বড় ধরনের চাপের আশঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে ১৭তম সংসদ অধিবেশনে। বৈশ্বিক যুদ্ধের মেঘ আর অভ্যন্তরীণ বাজার ও নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে জাতীয় সংসদের এই অধিবেশন ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও উত্তপ্ত।
সোমবার (২০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সংসদকে এই উদ্বেগের কথা জানান। সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানে আমাদের তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত পণ্যের বড় চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধিতে আমদানি ব্যয়, শিপিং চার্জ ও বিমা খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে রপ্তানি হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সরকার এই সংকট মোকাবিলায় লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং যুদ্ধের প্রভাবমুক্ত নতুন নতুন দেশে বাজার সম্প্রসারণের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।
অধিবেশনে দেশের রপ্তানি আয়ের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৫৫.১৯ বিলিয়ন ডলারে। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনো একটি বড় চিন্তার বিষয়। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছাড়া এই অঞ্চলের বাকি সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বড় অংকের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গেই ঘাটতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৭ হাজার ৮৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া পাকিস্তানে ৬৮১ মিলিয়ন এবং আফগানিস্তান ও ভুটানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঘাটতি বিদ্যমান।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি জানান, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে ইতোমধ্যে ১১০টি পণ্যের শুল্ক সম্পূর্ণ রহিত এবং ৬৫টি পণ্যের শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেন, জ্বালানি তেলের সামান্য মূল্যবৃদ্ধি দেশের মূল্যস্ফীতিতে তেমন বড় প্রভাব ফেলবে না। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, একটি শিল্প কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয়ের মাত্র ৭-৮ শতাংশ খরচ হয় জ্বালানিতে। সেখানে ১৫ শতাংশ দাম বাড়লেও সামগ্রিক উৎপাদন খরচে তার প্রভাব খুবই নগণ্য। পরিবহনের ক্ষেত্রেও পণ্যপ্রতি এই বাড়তি ব্যয়ের ভার অত্যন্ত সামান্য বলে তিনি দাবি করেন।
এছাড়া আজকের অধিবেশনে দেশের খাদ্য মজুত ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিয়ে ইতিবাচক তথ্য উপস্থাপন করা হয়। খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, বর্তমানে সরকারি গুদামে ১৭.৭১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যার মধ্যে চালের পরিমাণ ১৪.৬৪ লাখ মেট্রিক টন। এই মজুত পরিস্থিতিকে তিনি ‘সন্তোষজনক’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান, আগামী বোরো মৌসুমে ১২ লাখ টন সিদ্ধ চালসহ মোট ১৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের বড় পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে এবং ২০২৫ সালে ১১ লাখেরও বেশি কর্মীর নতুন করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে।
এদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি নিয়ে সংসদে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বতন্ত্র সদস্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা অভিযোগ করে বলেন, গত দেড় বছর ধরে দেশ কার্যত ‘মব-এর শহরে’ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট ও আদালত প্রাঙ্গণেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের গণপিটুনির মতো নৃশংস ঘটনার বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহ পাচ্ছে।
অন্যদিকে নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুউদ। তিনি জানান, তার এলাকা হাতিয়ায় ভূমিদস্যু ও জলদস্যুদের রাজত্ব চলছে এবং তাকে সরাসরি অস্ত্র হাতে কোপানোর ভিডিও প্রমাণ থাকার পরও সন্ত্রাসীরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। এমনকি মসজিদে তার জন্য দোয়া করায় ইমামের ওপরও হামলা হয়েছে।
ডেপুটি স্পিকার এই অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুতর আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ আশ্বস্ত করে বলেন, সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যদি হামলার এই ঘটনাগুলো সত্য হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সরকার অপরাধীদের ছাড় দেবে না। সংসদ সদস্যকে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা বা জিডি করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ দায়ের করা হলে পুলিশ দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কেবল এই সংসদ সদস্যই নন, হাউজের যেকোনো সদস্য যদি এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হন বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে তা যেন তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় থানাকে অবহিত করা হয়। সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর এবং সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্বালানি সংকট নিয়ে অধিবেশন চলাকালে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান সরকারের তথ্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকার সংসদে বলছে তেলের কোনো সংকট নেই, অথচ সংসদের বাইরে মানুষ তেলের জন্য হাহাকার করছে। জ্বালানি সংকটের কারণেই আজ উচ্চ আদালতকে ভার্চুয়ালি কাজ করতে হচ্ছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা এই সংসদে যদি জনগণের এই চরম দুর্ভোগ নিয়ে আলোচনা না হয়, তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কোনো সার্থকতা নেই। তিনি এই সংকটকে ‘সবচেয়ে বার্নিং ইস্যু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাব করেন।
বিরোধীদলীয় নেতার সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে তেল বা গ্যাসের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। মূলত পাচার ও অপচয় রোধ করে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতেই সরকার একটি সহনীয় পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি করেছে। তিনি বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, জ্বালানি মন্ত্রী ইতোমধ্যে এই বিষয়ে পরিসংখ্যান দিয়ে পরিস্থিতি পরিষ্কার করেছেন, তাই সংসদ মুলতবি করে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই।
এছাড়া জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন। আলোচনায় বিগত সরকারের শাসনকাল, দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বৈষম্যের চিত্র উঠে আসে।
হবিগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস এম ফয়সাল প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নমুখী উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সরকারের নানা পদক্ষেপ দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি তার এলাকার চা শ্রমিকদের অবহেলিত জীবনের কথা উল্লেখ করে তাদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই সুরে মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন আহমেদের কণ্ঠে। তিনি বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী চা শিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এই শিল্প ও এর সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, বিগত ১৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে ‘ধোঁকাবাজি’ ও ‘দুঃশাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যরা। ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নায়াব ইউসুফ আহমেদ বলেন, গত দেড় দশকে উন্নয়নের নামে জনগণকে কেবল বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে।
রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রব্বানি বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ছিল না; আমরা দেখেছি কীভাবে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়েছে এবং বিনা দোষে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান রাষ্ট্রপতির ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার যখন গান পাউডার দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে, তখন রাষ্ট্রপতি নীরব ছিলেন। তাই তাকে ধন্যবাদ জানানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল বারী টিপু বিগত আমলকে গুম-খুনের ‘আয়না ঘর’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
আঞ্চলিক সমস্যার কথা তুলে ধরে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান বেলাল ও দিনাজপুর-৫ আসনের এ জেড এম রেজওয়ানুল হক বলেন, তাদের এলাকা চরম অবহেলিত। সেখানে উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও পাকা রাস্তার তীব্র সংকট রয়েছে।
দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম জেলাটিকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতু সংস্কার ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান চালুর দাবি জানান। এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার জোর দাবি জানান মুশফিকুর রহমান, এনামূল হক ও জসিম উদ্দিন আহমেদ।
সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু দেশে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব কালচার’ বন্ধের আহ্বান জানান। এছাড়াও সভায় বক্তব্য দেন রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন এবং কুমিল্লা-৭ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুল আলম। আলোচনা শেষে স্পিকার অধিবেশন মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট




.webp)





