বুধবার   ২২ এপ্রিল ২০২৬ || ৮ বৈশাখ ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১০:৪৫, ২২ এপ্রিল ২০২৬

জুলুম ও হেজিমনির বিরুদ্ধে প্রাণ-প্রকৃতির শক্তি

জুলুম ও হেজিমনির বিরুদ্ধে প্রাণ-প্রকৃতির শক্তি
সংগৃহীত

সৌরজগতে এক বিরল অভিজ্ঞতা ঘটে গেছে। চাঁদের কক্ষপথ থেকে পৃথিবীর মানুষেরা তাদের গ্রহের উদয়-অস্ত দেখতে পেয়েছে। সচরাচর ‘প্রাকৃতিক দৃশ্যের’ ছবি আঁকতে গিয়ে আমরা সূর্য বা চাঁদের উদয়-অস্তের ছবি আঁকি। এবার ছবিটা অন্যভাবেও দেখা সম্ভব। কিন্তু কী দেখেছে মানুষ?

এক বিমর্ষ, বিক্ষত, চুরমার পৃথিবী। পৃথিবীর এই নিদারুণ করুণ চেহারা মানুষই করেছে। প্রকৃতিতে অন্যায়ভাবে শ্রেষ্ঠতার বাহাদুরি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই এই গ্রহকে ক্লান্ত করে তুলেছে মানুষ। মানুষ এক আগ্রাসী জীব, সবকিছু গ্রাস করতে চেয়েছে। ভূমি থেকে জঙ্গল, নদী থেকে পাহাড়, নালা, গাছ কিংবা স্মৃতি থেকে বিস্মৃতি সব।

কর্তৃত্ব, দখল, দূষণ, লুণ্ঠন, যুদ্ধ, বৈষম্য কী উপনিবেশিকতা সব মানুষের আবিষ্কার। নিজের কুকর্মফলেই আজ ভুগছে মানুষ। জরা-ব্যাধি থেকে নানান বিপন্ন বিপদের কুণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে আজ এই অসহায় প্রজাতি। পৃথিবীর মাত্র ২০ ভাগ লুটেরা আহাম্মক এই দুর্দশার জন্য দায়ী।

প্রকৃতি ও সংস্কৃতির জিনলিপিতে জারি থাকা বার্তাগুলো তারা পাঠ করতে চায়নি। পাতাল থেকে খুবলে তুলেছে পৃথিবীর জীবাশ্ম রস। আকাশ ঢেকে দিয়েছে কার্বনের দমবন্ধ পর্দায়। মুনাফা গড়েছে তেল, গ্যাস, কয়লা ও খনিজের। দুনিয়ার তাবত প্রাণসম্পদ দখলে উন্মত্ত এই লোভ যুদ্ধ আর গণহত্যা জারি রেখেছে।

প্রতিদিন দুনিয়াময় বাড়ছে পিপাসার্ত মানুষের পানির লাইন। দীর্ঘতর হচ্ছে বুনোপ্রাণের মৃত্যু মিছিল। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা কিংবা তাপদাহে অস্থির মানুষ জীবিকার সন্ধানে জন্মমাটি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হচ্ছে প্রতিদিন। একইসাথে যুদ্ধরত পৃথিবীতে আজ তেলের জন্য জীবন কাটছে রাস্তায় রাস্তায়।

পৃথিবীর প্রতি এই নিষ্ঠুরতা আর নির্দয় প্রকল্পগুলো বৈধ হচ্ছে কীভাবে? কারণ আমরা আমাদের প্রশ্ন করছি না। আমরা কেন প্রাণ-প্রকৃতির ওপর প্রশ্নহীন খুনখারাবিকে বৈধতা দিয়ে চলেছি? এই নিদারুণ নিশ্চুপ থাকার মর্মমূলে কী অম্ল-মধুর যাতনা?

পৃথিবীটা এক হীরক রাজার দেশ। হীরকের রাজা গরিব প্রজাদের ওপর জুলুম করে তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন। প্রাণ-প্রকৃতি হত্যার কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গিকে আমরা ধারণ করে আছি। আমাদের মনস্তত্ত্ব ও তৎপরতা কিংবা শরীর ও মগজ মূলত পরিবেশ-গণহত্যার ক্ষমতাবান কাঠামোকে সমর্থন করে।

আমরা মূলত কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকাঠামোর পাতানো রসায়নে বুঁদ হয়ে আছি। কেবল বলপ্রয়োগ, সামরিক শক্তি বা নিয়ন্ত্রিত বাজার দিয়ে নয়; ক্ষমতাকাঠামো মূলত নাগরিকের চিন্তা ও মূল্যবোধকেও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতার সপক্ষে সম্মতি অর্জন করায়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসকের পাতানো মূল্যবোধই আমাদের কাছে ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

তাই নেত্রকোণার সুসংদুর্গাপুরের প্রাচীন পাহাড়ি টিলাকে টুকরো টুকরো করে চিনামাটির বাসন কী টাইলস বানানো হয়। ‘বিজয়পুরের সাদামাটি’ হিসেবে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই) স্বীকৃতি দিয়ে উল্লাস করি। গ্যাস জরিপের নামে মাগুরছড়াকে অঙ্গার করি বা হাতিদের সংসার দখল করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলি।

শখের বসে সাতবস্তা পাখি হত্যা করি কিংবা সিলেটের হরিপুরে পাখির লাশের হোটেল বসাই। ক্ষমতা কাঠামোর এই বিনাশী মূল্যবোধের প্রতি আচ্ছন্ন ও বুঁদ হয়ে তাকে সম্মতি প্রদানকেই দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি হেজিমনি হিসেবে দেখান। প্রাণ-প্রকৃতির ওপর জুলুমের পক্ষে বক্তব্য নির্মাণকারী রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকাঠামোর হেজিমনির কারাগার চুরমার না হলে পরিবেশ-গণহত্যা থামবে না।

প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী’। পৃথিবী গ্রহের সাথে বাঁচতে হলে প্রাণ-প্রকৃতির নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বিএনপি সরকার ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কী পাখি, গাছ, মাছ, পতঙ্গ কী বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তা দিতে প্রস্তুত?

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে ‘সবাই’ মানে কেবলমাত্র মানুষ নয়; সব প্রাণ-প্রজাতি নিয়েই সবার বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর ঘটে যাওয়া কিছু নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে ধরিত্রী দিবসের আলাপখানি শুরু হচ্ছে।

মৌমাছি, শামুক, পাখি কিংবা অণুজীবের দুনিয়া

নিজের খাদ্য উৎপাদন কী সংগ্রহ, বিস্তার কী বাণিজ্যের কারণে পৃথিবীর প্রাণসম্পদের ওপর চরম অন্যায় করেছে মানুষ। স্যাপিয়েন্স মানুষই দুনিয়ায় কৃষির সূচনা করে। লাখো বুনো জাতকে জোর করে আবাদি বা গৃহপালিত করেছে মানুষ। কিংবা বুনো গাছপালা ও প্রাণীরাই মানুষকে করেছে গৃহবন্দি।

মৌমাছি, শামুক, পাখি বা অণুজীবের ময়দান থেকে জীবনপাঠের চর্চা অব্যাহত থাকেনি। উন্নয়নের নামে বিষ ও বলপ্রয়োগ জারি রেখে বাস্তুতন্ত্র থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে নিযুত অণুজীব। 

যাই হোক কৃষি বিকাশের ১৩ হাজার বছরের দীর্ঘযাত্রায় প্রাণ-প্রজাতির করুণ গণবিলুপ্তি ঘটেছে। খাদ্যের অবারিত উৎসকে বর্জন করে স্যাপিয়েন্স মানুষ ক্রমশই শর্করানির্ভর হয়েছে। বদলেছে দাঁতের গড়ন। পাল্টেছে সমাজের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের গণিত।

কাঁচামাল লুটপাট ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৈরি হয়েছে উপনিবেশ। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম বা প্রযুক্তিগত প্রবণতা সমাজকে কেবল সামনের দিকে ঠেলে দিলো। পেছনে ফিরে তাকানোর আর কোনো সুযোগ রইলো না। প্রকৃতির ও সংস্কৃতির যুগলসন্ধির আদি চক্রাকার ধারণাটি ক্রমশই কোণঠাসা হলো।

মৌমাছি, শামুক, পাখি বা অণুজীবের ময়দান থেকে জীবনপাঠের চর্চা অব্যাহত থাকেনি। উন্নয়নের নামে বিষ ও বলপ্রয়োগ জারি রেখে বাস্তুতন্ত্র থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে নিযুত অণুজীব। আর আজ এই অণুজীবেরা যখন মানুষের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, মানুষের যাবতীয় ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ছে।

একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনাভাইরাস পুরো পৃথিবীকে উল্টেপাল্টে দিয়েছিল। পাখিরা পোকামাকড় খেয়ে মানুষের শস্যফসল বাঁচায়। অথচ প্রতি বছর দেশে ‘ফসল রক্ষার নামে’ নিষ্ঠুর পাখি গণহত্যা চলছে। কৃষি, খাদ্য, পরিবেশ কিংবা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কেউ পাখি হত্যার বিরুদ্ধে ক্ষমতার বলয় ভেঙে দাঁড়ায়নি।

এভাবেই প্রাণ-প্রকৃতির উপর নিষ্ঠুরতা বৈধতা পায় ও নাগরিক সম্মতির হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করে চলে। আর তাই অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা শখের বসে সাত বস্তা পাখি খুন করেন। কিংবা বাসের দমবন্ধ লাগেজ রাখার বক্সে ছাগল বোঝাই করে হত্যা করা হয়।

চিত্রা হরিণটির জন্য কেউ রাজপথে নামেনি

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের উপকূলে গড়ে ওঠেছিল ম্যানগ্রোভ বন। চিত্রা হরিণ, মেছো বিড়াল, বেজি, সাপ, শেয়াল ও পাখিরা পেতেছিল সংসার। বন্যপ্রাণীর সংসার তছনছ করে গড়ে তোলা হয় জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এক উদ্বাস্তু চিত্রা হরিণ তার হারানো গ্রামে ফিরেছিল।

১১ এপ্রিল ২০২৬ হরিণটিকে মেরে হত্যার ভিডিওটি সামাজিকমাধ্যমে দেয় খুনিরা। সামাজিকমাধ্যমে এই নিষ্ঠুর ভিডিওকে ‘সংবেদনশীল কনটেন্ট’ মনে হয়নি। কারণ এইসব মাধ্যমও একই হেজিমনির অংশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে অস্থির ব্যবস্থার কাছেও বন্যপ্রাণী হত্যার ভিডিও কোনো ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয় না। জুলুমের বিরুদ্ধে ফেনিয়ে ওঠা কাউকে চিত্রা হরিণটির সপক্ষে রাজপথে নামতে দেখা যায়নি।  

ধনীদের ফ্লাইওভার ও ৩০টি কাঠবাদাম গাছ

নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ২০১০ সালে ৭০টি কাঠবাদাম গাছের চারা রোপণ করেছিল। ১৬ বছর পর ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য সড়ক সম্প্রসারণের অজুহাত দেখিয়ে ১৬-১৯ এপ্রিলের ভেতর ৩০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।

এর আগেও ঢাকার সাত মসজিদ সড়কের বিভাজকের জন্য প্রাচীন বৃক্ষদের হত্যা করা হয়। এক্সপ্রেসওয়ের একটা র‌্যাম্প নামানোর জন্য ঢাকার পান্থকুঞ্জ পার্ককে দুমরেমুচরে ফেলা হয়। প্রমাণিত হয়েছে এসব ফ্লাইওভার কিংবা পান্থকুঞ্জের র‌্যাম্প ধনীদের বিলাসিতার জন্য, তাদের গাড়ি চলাচলের জন্য।

গাছ না কেটে যেসব প্রকৌশলী উন্নয়ন অবকাঠামোর নকশা করতে পারেন না, এমন প্রকৌশল জ্ঞান দিয়ে পৃথিবী কী করবে? অথচ এই গাছ হত্যাকারীদের প্রত্যেকেই সারাজীবন গাছ থেকে বিনামূল্যে অক্সিজেন পান।

২৯ বাবুই ছানার লাশের দাম কত?

১৪৩৩ বাংলার শোভাযাত্রায় এক লাল রাতা মোরগ নতুন দিনের বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার বাছা মিয়া মোরগের সেই বার্তাকে অস্বীকার করলেন। নিজের বাড়ি থেকে অনেক দূরের এক তালগাছ থেকে ২৭টি বাবুই পাখির বাসা ভেঙে গুড়িয়ে দেন। পা দিয়ে পিষে পিষে পাখির ডিম ও ছানাদের খুন করেন। গ্রামবাসীরা বাধা দিলে তিনি পালিয়ে যান।

গ্রামবাসীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত সেখানে ২৯টি বাবুই ছানার লাশ উদ্ধার করে। অভিযুক্ত অপরাধ স্বীকার করে বলেন তার ক্ষেতের ধান খেয়ে ফেলার ‘অপরাধে’ পাখিদের খুন করেছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও একদিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। ২৭টি পাখির কলোনি নষ্ট করে এতগুলো পাখি ও ডিম মেরে ফেলার শাস্তি ও দণ্ড কখনোই এমন হতে পারে না।

এই ঘটনাসহ বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন লঙ্ঘন করছে। যদি একটি বাসা ও একটি পাখি হত্যা হতো তাহলে কি শাস্তি হতো? এসব ক্ষেত্রে কেবল সংখ্যা দিয়ে ন্যায়বিচার হবে না, বরং বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ তৈরি করতে হবে। একইসাথে গ্রামবাসীদের ঐক্যকে আরও জোরালো করতে হবে। বাছা মিয়াদের মতো পাখি খুনিদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

বিষ দিয়ে মাছ হত্যা কোন ধরণের ব্যাটাগিরি?

একটা সময় বিষটোপ কেবল দিয়ে পাখি হত্যা হতো। ২০১০ সালের পর থেকে বিষ দিয়ে পুকুরের মাছ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ শুরু হয়েছে। নিজেদের ব্যক্তিগত রেষারেষি, দ্বন্দ্ব, ঝগড়া নিজেরা সামাল না দিতে পেরে কোনো পক্ষ অপরপক্ষের পুকুরের অসহায় মাছেদের বিষ দিয়ে মারে। মানুষ তার ঝগড়ার ব্যাটাগিরি ফলায় মাছেদের ওপর।

গণমাধ্যম এসব খবরে মাছেদের প্রাণের মূল্যের চেয়ে মাছচাষী খামারির ‘আর্থিক ক্ষতির’ বিষয়টি বেশি প্রকাশ করে। এসব নিউজ ট্রিটমেন্টও সেই প্রবল হেজিমনি ধারণ করে।

নাটোরের সিংড়ার ডাহিয়া ইউনিয়নের লালুয়া পাঁচ পাখিয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ১৯ এপ্রিল ২০২৬ সকালে পুকুরে গিয়ে দেখেন সব মাছ মরে ভেসে আছে। দুর্বৃত্তরা গুলশা ও পাবদা মাছ ভর্তি এই পুকুরে বিষ দিয়েছিল। এমনকি বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবনে বিষ দিয়ে মাছ খুন বন্ধ হয়নি। বিষ দিয়ে মাছ হত্যাকারীদের আইন ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। সামাজিকভাবে সব ধরনের মাছ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা দরকার।

প্রবল হেজিমনির বিরুদ্ধে জনতার শক্তি

প্রবল হেজিমনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি নতজানু আচ্ছন্নতাকে মহামতি খনা তুমুলভাবে প্রশ্ন করেছিলেন। খনার স্বামী মিহির ও শ্বশুর বরাহ ছিলেন রাজপণ্ডিত। জ্যোতিষশাস্ত্র থেকে জ্যোতির্বিদ্যা সবকিছু তাদের দখলে ছিল। তারা এমন এক জ্ঞানকাণ্ডকে পোক্ত রেখেছিলেন, গ্রামবাসীরা কেবলমাত্র সেসবই ‘সত্য’ বলে মেনে নিতে বাধ্য ছিল।

...ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে অস্থির ব্যবস্থার কাছেও বন্যপ্রাণী হত্যার ভিডিও কোনো ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হয় না। জুলুমের বিরুদ্ধে ফেনিয়ে ওঠা কাউকে চিত্রা হরিণটির সপক্ষে রাজপথে নামতে দেখা যায়নি।

বরাহ-মিহিরের ক্ষমতার বলয়ে গ্রামীণ কৃষক সমাজ বুঁদ ও আচ্ছন্ন হয়েছিল। গ্রামীণ জনগণের লোকায়ত জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রাণসম্পদ ব্যবস্থাপনার কোনো মূল্যায়ন ছিল না। প্রবল খরার দিনে রাজ্যব্যাপী হাহাকার ওঠলো কবে বৃষ্টি নামবে? কে দিতে পারে আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস?

ক্ষমতাধর রাজপণ্ডিতেরা গাদা গাদা বই পুস্তক মেলে খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। খনা তখন প্রাণ-প্রকৃতিজাত লোকায়ত জ্ঞানের সপক্ষে দাঁড়ালেন। নির্ভয়ে বললেন,

‘কি কর শ্বশুর লেখাজোকা,

মেঘেই দেখ জলের রেখা,

কোদাল কুড়ুলে মেঘের গা,

মধ্যে মধ্যে দিচ্ছে বা,

চাষীকে বলোগে বাঁধতে আল,

আজ না হয় হবে কাল’।

খনা জানালেন, বৃষ্টি কবে হবে এটা বোঝার জন্য বইয়ের পাতা নয়, মেঘের পাতায় তাকাতে হবে। চারধারের প্রকৃতি ও আবহাওয়াকে পাঠ করতে জানতে হবে। খনার বচনই গ্রামীণ কৃষক সমাজে বিজ্ঞান সত্য হয়ে কুসুম মেলল।

ইতিহাস থেকে ইতিহাসে বহু মানুষ, বহু সমাজ ও বহু জীবনব্যবস্থা ক্ষমতাকাঠামোর আচ্ছন্নতার শেকলে বন্দি থাকতে চাননি। জীবনবাজি রেখে প্রমাণসমেত লড়াই করে গেছেন। ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি আচ্ছন্ন হয়ে ক্ষমতার ভাষায় আহা-উহু করেননি। রাজার কুড়ালের কোপ থেকে খেজুর গাছ বাঁচাতে গাছ জড়িয়ে ধরে দ্বিখণ্ডিত হন অমৃতা দেবী।

রাজার নির্দেশ অমান্য করে হাতি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহীদ হন হাজং মনা সর্দার। বালিশিরা পাহাড় বাঁচাতে প্রাণ দেন সালিক ও গণি। বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের থেকে কৃষিজমি বাঁচাতে জীবন দেন জায়েদা ও করুণাময়ী সর্দার। শালবন বাঁচাতে বনবিভাগ ও পুলিশের গুলিতে নিহত হন পীরেন স্নাল।

এরা ক্ষমতার হেজিমনির আয়নায় জীবনকে পাঠ করেননি। পৃথিবীতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার কায়দার বিপরীতে জীবনবাজি রেখেছেন। ক্ষমতার অ্যানথ্রোপোসেন্ট্রিক বাহাদুরিকে (মানুষকেন্দ্রিকতা) প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু দেশ ও দুনিয়া কী সেই মর্ম ধারণ করে চলছে? আর্টেমিস-২ নভোযান থেকে দেখা পৃথিবীর ভেতরের গল্প তাহলে এত বিমর্ষ, মলিন ও বিক্ষত কেন?

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট