বৃহস্পতিবার   ২১ মে ২০২৬ || ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১১:৫৩, ২০ মে ২০২৬

হাম ও টিকা নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে সরকার

হাম ও টিকা নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে সরকার
সংগৃহীত

দেশে হামের বিস্তার, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্যখাতের জরুরি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, টিকা বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের অভিযোগ, হাম পরিস্থিতি ও টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে, যার ফলে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে পাইনেট আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা, অপারেশন প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, টিকা বিতরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তারা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অপারেশন প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এ সিদ্ধান্ত তৎকালীন সরকার একা নেয়নি। ২০২২-২৩ সালের সময়ে যারা ওপি-তে ফান্ড প্রদান করত, তাদের সমন্বয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অপারেশন প্ল্যান যখন ১৯৯৭ সালে শুরু হয়, তখন এ খাতে ৭০ শতাংশ অর্থ বিদেশ থেকে আসত। পরে বিদেশি অর্থ কমে গেলে এটি পরিচালনা নিয়ে সিদ্ধান্তগত টানাপোড়েন শুরু হয়। এ টানাপোড়েনের কারণেই ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইনের টিকা ক্রয় নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। টিকা ক্রয়ের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দও রেখেছিল। কিন্তু টিকা অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে কেনা হবে, নাকি ওপেন টেন্ডারে ক্রয় করা হবে এ বিতর্কের কারণে শেষ পর্যন্ত টিকা ক্রয় করা হয়নি।

তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টে সরকার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাদের সতর্ক করেছিলেন যে, টিকা ক্রয় না করলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। কিন্তু তারা দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না শুনে ইউনিসেফের পরামর্শ অনুযায়ী নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য তাদের মাধ্যমেই টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। সেই টিকা নির্বাচনের প্রায় এক মাস আগে বাংলাদেশে আসে। তখন আর ক্যাম্পেইন পরিচালনার মতো সময় ছিল না। পরে গত মাস থেকে সরকার সেই টিকাই ব্যবহার করে ক্যাম্পেইন শুরু করেছে।

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য দেওয়া হয় না। টিকা আমাদের ছিল, কিন্তু টিকা বিতরণের জন্য গাড়ির জ্বালানি কেনার অর্থ ইউএসএআইডি দিতো। কিন্তু সেটিও আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে টিকা বিতরণও বন্ধ থাকে। এরপর যারা টিকা বহন করে কেন্দ্রে নিয়ে যায়, তাদের ৯ মাস ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন এসব সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ চেয়েছিল, তখন তারা জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন না করায় প্রয়োজনীয় অর্থ দেয়নি। বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ জরুরি অবস্থা চলমান ছিল। কিন্তু তারাও বিষয়টি অনুধাবন করেনি। যখন শিশুদের মৃত্যু শুরু হলো, তখন তাদের কাছে এটি জরুরি বলে মনে হয়েছে। ক্ষমতায় যে-ই আসে, তারাই স্বাস্থ্যখাতকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করে। দেশে দুর্যোগের সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার কী দায়িত্ব, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও কেন তেমন ব্যবস্থা থাকবে না সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, অপারেশন প্ল্যান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে মনে করেছে, তারা একটি বৈপ্লবিক কাজ করবে এবং এটি বন্ধ করে দেবে। কিন্তু বন্ধ করার আগে জরুরি পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। এ দায় তাদেরও নিতে হবে। স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে এমন সতর্কতা দেওয়ার পরও কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হুট করে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি জেনে হোক বা না জেনে হোক, তাদের অবশ্যই দায় স্বীকার করতে হবে। আর বর্তমান সরকার আর কতবার আগের সরকারের ওপর দায় চাপাবে? এখন যে শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা কি বন্ধ করা যায় না? এর দায়ও বর্তমান সরকারকে নিতে হবে।

গোলটেবিলে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্যখাত সংস্কার প্রস্তাবনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তা বর্তমান সরকারকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। কোনো প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কোনগুলো করা হবে না, সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা জাতিকে দিতে হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, হাম পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, সরকার বলছে টিকার কারণে এ অবস্থা হয়েছে, অথচ আইসিইউতে সামান্য অক্সিজেনের পাইপ না থাকার কারণে শিশুরা মারা যাচ্ছে। পেডিয়াট্রিক আইসিইউ নেই, কোথাও থাকলেও পর্যাপ্ত লোকবল ও অক্সিজেন সরবরাহ নেই। ফলে সরকার হামের মতো একটি রোগের চিকিৎসা দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে সরোয়ার তুষার বলেন, আমি মনে করি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। তিনি এপ্রিল মাসে বলেছেন, ছয় মাসের টিকা মজুত আছে। আবার গতকাল বলেছেন, ২০২০ সালের পর থেকে আমাদের হাতে কোনো টিকা নেই। আপনি (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) গত পাঁচ বছরে মাসওয়ারি কত ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য জনগণকে না দেওয়া পর্যন্ত এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না। এটি সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আমার অনুরোধ। এর আগে প্রধানমন্ত্রীও সংসদে হাম নিয়ে একই ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। ফলে জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে। আপনাদের সঠিক তথ্য দিতে হবে। গত পাঁচ বছরে কোনো মাসে কত টিকা প্রদান করা হয়েছে, সেটি আমরা জানতে চাই।

টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, প্রত্যেক মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট যেমন আলাদা, তেমনি তাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমও ভিন্ন। কাজেই বর্তমানে শিশুদের যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা তাদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারছে কিনা, সেটি পরীক্ষা করতে হবে। যদি পর্যাপ্ত ইমিউনিটি তৈরি না হয়, তাহলে টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিকল্প চিন্তা করতে হবে।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

বৃহস্পতিবার   ২১ মে ২০২৬ || ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১৭৩জন