চিকিৎসক জিসানের মরদেহের সুরতহালের সময় আসে চাকরি স্থায়ীকরণের চিঠি
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা তরুণ চিকিৎসক আবিদ হাসান জিসান (২৬) আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলছিল তার সুরতহাল তখনই তার মেসে আসে পপুলার হাসপাতাল থেকে চাকরির কনফার্মেশনের চিঠি। যেখানে গত ১৫ দিন ধরে চাকরি করছিলেন জিসান।
মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্মোহ তদন্ত, নিবিড়ভাবে মনোযোগ দিয়ে সুরতহাল করছিলাম। এমন সময়ই খবর আসে মেসে জিসানের চাকরি স্থায়ীকরণের চিঠি এসেছে। শোনার পর খুবই খারাপ লাগছিল। পরিবার, স্বজন, বন্ধুরা আরেকবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুলিশ, সহপাঠী ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর গত বছর একই কলেজ থেকে ইন্টার্ন শেষ করে জিসান। এরপর তিন মাস আগে ধানমন্ডি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মেডিসিন বিভাগে চাকরি নেন। শাহবাগ থানাধীন হাবিবুল্লাহ সড়কের ইউরেকা নামক একটি মেসে থাকতেন। মেসটির অধিকাংশ মেম্বারই পেশায় চিকিৎসক।
এখানে উল্লেখ্য যে, সোমবার (৪ মে) দুপুর আড়াইটার দিকে তার বন্ধু ও রুমমেট অচেতন অবস্থায় জিসানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে মৃত জিসানের বন্ধু ও রুমমেট দ্বীপ্ত সিংহ জানান, সকালে বের হওয়ার সময় তাকে রুমে ভালোই দেখে গেছি। দুপুর ১টার দিকে জিসানের বড় ভাই জাহিদ হাসান ফোন দিয়ে বলে জিসান ফোন ধরছে না, বিষয়টা একটু দেখতে। এরপর বাসায় গিয়ে জিসানকে বিছানায় অবচেতন অবস্থায় দেখতে পাই। কয়েকবার ডেকেও কোনো সাড়া-শব্দ পাইনি। এরপর দ্রুত জিসানকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই। চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মৃত বলে জানান।
দ্বীপ্ত বলেন, জিসানের হাই প্রেসার ছিল। নিয়মিত ওষুধ সেবন করতেন। কীভাবে কি থেকে কি হয়ে গেল। খুবই কষ্ট হচ্ছে। চিকিৎসক হয়ে একজন চিকিৎসকের এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কষ্টকর।
এ বিষয়ে কথা হয় বড় ভাই জাহিদ হাসানের সঙ্গে। তিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন নারায়ণগঞ্জে। জাহিদ হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, তাদের চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পলাশপাড়া গ্রামে। বাবার নাম আহসান হাবিব। আমরা দুই ভাই, জিসান ছিল ছোট। গত বছর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে ইন্টার্ন শেষ করে। গত এপ্রিলের ২২ তারিখে জিসান রাজধানীর ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতালে চাকরি নেয়। সেখানে নিয়মিত রোগী দেখতো।
তিনি আরও জানান, এর আগে জিসান ধানমন্ডি স্পেশালাইজড হাসপাতালে কর্মরত ছিল। সেখানে গত ১ মে পর্যন্ত চাকরি করেছে। সর্বশেষ প্রায় সাতদিন দুই হাসপাতালেই সময় দিতে হয়েছে। নাইট ডিউটি ছাড়াও দুই হাসপাতালে সময় দেওয়াও একটা বাড়তি চাপ হয়ত তৈরি করেছিল উচ্চরক্ত চাপে ভোগা জিসানের জন্য।
তিনি বলেন, জিসান খুবই আদরের ছিল আমাদের। দিনে দুই থেকে তিনবার ফোন করে তার খবর নিতাম। গতকাল সকালে একবার ফোন করে ওকে পাচ্ছিলাম না। পরে ওর বন্ধুর মাধ্যমে ওকে ডেকে তুলে কথা বলি। কারণ খালাকে নিয়ে ওর আই হাসপাতালে যাওয়ার কথা। জিসান জানায়, একটু রেস্ট নিতে চায়। তার খালাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে। দুপুরে আবার ফোন করি। অনেকবার ফোন দিয়ে জিসানকে পাচ্ছিলাম না। পরে বন্ধু ও রুমমেট দ্বীপ্তকে ফোনে বিষয়টা বলি। দীপ্ত মেসে এসে জিসানকে অবচেতন অবস্থায় দেখে হাসপাতালে নেয়। খবর পেয়ে আমিও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে জানতে পাই জিসান আর নেই।
ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বড় ভাই জাহিদ বলেন, জিসানের হাইপ্রেসার ছিল, নিয়মিত ওষুধ খেত। কীভাবে ওর মৃত্যু হলো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হয়ত ওইটাই কারণ ছিল। আমাদের মনোকষ্ট যে ওর চিকিৎসার জন্য চেষ্টাও করতে পারলাম না। আজকে গ্রামের বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক(এসআই) রেজাউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, চিকিৎসক জিসান পিজি হাসপাতালে এফসিপিএস পার্ট-১ করছিল। পাশাপাশি পপুলার হাসপাতাল গত ১৫ দিন ধরে চাকরি করছিলেন জিসান। এর আগে তিনি ধানমন্ডি স্পেশালাইজড হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ দুই হাসপাতালেই সময় দিতে হচ্ছিল জিসানকে। হাইপার টেনশনে ভোগা একজন দীর্ঘস্থায়ী রোগীর জন্য এটা ক্ষতিকর বলেই মনে করছেন চিকিৎসকরা।
আগে থেকেই অসুস্থ ছিল। হাইপার টেনশনে ভুগছিলেন। দীর্ঘদিনের এই অসুস্থতা সম্পর্কে পরিবার আগে থেকেই জানতো উল্লেখ করে শাহবাগ থানার এসআই রেজাউল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেদিন মারা গেছেন সেদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকেও তার মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তার খালাকে সঙ্গে নিয়ে আই হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল। রুমমেট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে মায়ের সঙ্গে কথা বলায়। এরপর রুমমেট হাসপাতালে চলে যায়। আবারও ঘুমিয়ে পড়েন জিসান। এদিকে বাড়ি থেকে ফোন, খালার ফোন। কারো মোবাইল ফোনের কল রিসিভ করছিল না জিসান। পরে রুমমেটসহ মেসের কেয়ারটেকার এসে দেখে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এসআই রেজাউল ইসলাম বলেন, ঢামেক হাসপাতালেই জিসানের মরদেহের নিবিড়ভাবে মনোযাগ দিয়ে সুরতহাল করছিলাম। এমন সময়ই খবর আসে মেসে পপুলার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক জিসানের চাকরি স্থায়ীকরণের চিঠি এসেছে। শোনার পর খুবই খারাপ লাগছিল।
তিনি বলেন, আমরা অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট











