মঙ্গলবার   ০৬ অক্টোবর ২০২৬ || ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

জাগ্রত জয়পুরহাট

প্রকাশিত : ১২:৪০, ৫ অক্টোবর ২০২৬

মাছ, সবজি ও পশু খামারে স্বপ্ন বুনছেন তরুণ উদ্যোক্তা নাফিজ

মাছ, সবজি ও পশু খামারে স্বপ্ন বুনছেন তরুণ উদ্যোক্তা নাফিজ
সংগৃহীত

জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে কৃষিকেই নতুন স্বপ্নের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা এ. এম আলী হায়দার নাফিজ। ইতোমধ্যেই সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তুলে অনন্য সফলতা অর্জন করেছেন তিনি। একই জায়গায় বিষমুক্ত শাক-সবজি চাষ, পুকুরে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছ চাষের পাশাপাশি ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল পালনের মাধ্যমে ‘জিনিয়াস অ্যাগ্রো’ নামে তিনি তৈরি করেছেন এক দৃষ্টান্তমূলক সমন্বিত কৃষি প্রকল্প।

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া ইউনিয়নের উত্তমপুর গ্রামে আলী হায়দার গড়ে তুলেছেন এই খামার। যেখানে বছরজুড়ে বিভিন্ন প্রকার শাক-সবজি, ফলমূলের পাশাপাশি ফসল এবং মাছ চাষ করা হয়। এই খামারে তিনি এখন পর্যন্ত সাতজন লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। আর এসব কিছু দেখাশোনা করেন তার বাবা মো. সিরাজুল ইসলাম। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির গাছ, যেমন-লাউ শাক, কুমার শাক, শসা, বরবটি, করলা ও বিভিন্ন ডাটা শাক রয়েছে। পুকুরে শিং মাছ, কই মাছ ও তেলাপিয়া মাছ। এ ছাড়া জাপানি মালটা, চায়না কমলা, কাঠবাদাম, কাজু বাদামসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলও রয়েছে তার খামারে। এসবের পাশাপাশি ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল রয়েছে খামারটিতে।

তরুণ উদ্যোক্তা এ. এম আলী হায়দার নাফিজ বলেন, আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিও করতাম। তখন আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায় ছাত্রদলের কর্মী ছিলাম। তাই লেখাপড়া শেষ করতে না করতে রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার হই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচন বানচালের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়। পরবর্তীতে জুলাই আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কারামুক্ত হই। ছাত্রদলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সময় (৫ বছর ৭ মাস ১৫ দিন) আমি কারাগারে ছিলাম।

কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নাফিজের শুরু হয় জীবন শুরুর নতুন চ্যালেঞ্জ। তখনো অনেকটাই দিশেহারা তিনি। পরে প্রবাসী এক স্বজনের পরামর্শে ফিরে যান নিজ গ্রামে, শুরু করেন কৃষি কাজ। প্রথমে অল্প জমিতে সবজি চাষ শুরু হলেও একে একে যুক্ত হয় মাছ, পশুপালন আর ফলনের বাগান। বর্তমানে এই জিনিয়াস অগ্রোফার্মে প্রায় ১০০টি ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জমিতে চাষ করা হচ্ছে নানা ধরনের শাকসবজি। যা দেখভাল করছেন কর্মচারীরা।

আলী হায়দার এলাকার সবার কাছে এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। তার এই খামার থেকে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার সবজি বিক্রি হয়। প্রতি তিন থেকে চার মাসে ২০-২৫ মন মাছ বিক্রি হয়। এ ছাড়া ১০০টি ভেড়া, ছাগল ও গাড়লে প্রতি ছয় মাসে অন্তত দু-একটি করে বাচ্ছা জন্ম দেয়। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শে খামারের পরিধি আরও বাড়াতে চান এবং খুব শিগগিরই হরিণ পালন করতে চান এই উদ্যোক্তা।

নাফিজ বলেন, আমি ঢাকা ছেড়ে গ্রামে এসে এলাকায় যে জমি আছে তাতে কৃষি কাজ করছি। সেইসঙ্গে আমি কিছু ছাগল-ভেড়া-গাড়লপলনের চেষ্টা করছি। প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে হরিণ পালনের জন্য যায়গা রেডি করেছি। উপজেলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমাকে প্রচুর হেল্প করছেন।

আলী হায়দার নফিজের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, গতানুগতিক কৃষির বাইরে এসে কীভাবে প্রতিটি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সেই পরিকল্পনা থেকেই তার এই উদ্যোগের সূচনা।

আলী হায়দারের খামারের শ্রমিক মো. বিল্লাল ছাগল, ভেড়া ও গাড়লের দেখভাল করেন। তিনি বলেন, ‘মোটামুটি ভালোই প্রফিট দেখা যাইতেছে। তারপর ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল আরও কিছু বাড়াইছি। আশা করি ভাবষ্যতে খামার আরও বড় হবে, ইনশাআল্লাহ।’

মাছ পালনে অভিজ্ঞ মো. মান্নান বলেন, আমরা নিজেরা খাই এবং বাজারে বিক্রি করি। মাছ চাষ বাড়াতে আমরা আরও কয়েকটি পুকুর কাটার চিন্তাভাবনা করেছি।

আলী হায়দার নফিজ বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি জানান, শুরুতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ খামারটি একটি লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমন্বিত কৃষি পদ্ধতির মূল সুবিধা হলো, এখানে একটি উপাদানের বর্জ্য অন্যটির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, ফলে উৎপাদন খরচ কম হয় এবং লাভের অনুপাত বাড়ে। ভবিষ্যতে নিজের খামারটিকে আরও বড় করার এবং স্থানীয় অন্যান্য তরুণদের খামার তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এই সফল উদ্যোক্তার।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল, দুবাই শাখার সভাপতি মো. মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস বলেন, মাটি ও চাষাবাদের প্রতি আমার ভালোবাসা চিরকালের। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ ছয় বছর আমাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে, ধ্বংস হয়ে গেছে আমার ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাসস্থান। একই মামলায় আমার ভাগনেকেও দীর্ঘ ছয় বছর কারাবন্দি থাকতে হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, কারামুক্তির পর ভাগনে যখন দিশেহারা, তখন আমি ওকে মাটির কাছে ফিরে আসার পরামর্শ দিই। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মাটিকে ভালোবাসলে মাটি কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। আমার সেই অনুপ্রেরণাতেই আজকের এই অ্যাগ্রো প্রজেক্ট—যেখানে এখন ছাগল, ভেড়া, গারল পালনের পাশাপাশি শাকসবজি ও মাছ চাষ করা হচ্ছে।

সবকিছু হারিয়েও মাটির ভালোবাসাকে সম্বল করে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক প্রামাণ্য দলিল আমাদের এই খামার। আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসা আমাদের মূল শক্তি, যোগ করেন তিনি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ওনার খামারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং ফলজ ও বনজ বৃক্ষ রয়েছে। এ ছাড়া ওনারা বনবিভাগ থেকে হরিণ পালনের অনুমোদন নিয়েছেন। খামারে একটি শেড তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে হরিণ পালন করবেন। আমরা বেশ কয়েকবার খামারটি পরিদর্শন করেছি। বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেছি। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসা. শাহিদা শারমিন আফরোজ বলেন, তার খামারে বিভিন্ন ধরনের সবজি, দেশি-বিদেশি ফল এবং অন্যান্য গবাদী পশুর রয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। আমরা ওনার খামার পরিদর্শন করেছি। 

তিনি আরও বলেন, তিনি (নাফিজ) নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করেছেন এবং পাশাপাশি অন্যদের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। রাজাপুর উপজেলা কৃষি অফিস সবসময় তার পাশে আছে সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে। ভবিষ্যতেও যে কোনো সমস্যা সমাধানে আমরা পাশে থাকবো। খামারটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছেন এই উদ্যোক্তা।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, তরুণদের এভাবে আধুনিক ও সমন্বিত কৃষিতে এগিয়ে আসা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

মঙ্গলবার   ০৬ অক্টোবর ২০২৬ || ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১৭৩জন

সর্বশেষ

শিরোনাম