অন্ধকার সেলে আর্তনাদের চিহ্ন, গুমজীবনের ভয়াবহ বর্ণনা দিলেন তিনি
প্রতিদিন আকাশে বিমানের শব্দ শুনতেন নাজিম উদ্দিন। পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসত জানাজার ঘোষণা। অন্ধকার সেলের দেওয়ালে লেখা ছিল বহু মানুষের নাম আর মোবাইল নম্বর। ‘বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হবে’— এমন হুমকিও শুনতে হয়েছিল তাকে। লাঠিপেটা, ঘুমবঞ্চনা, রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ আর মৃত্যুর হুমকির মধ্য দিয়ে কেটেছে তার দীর্ঘ পাঁচ মাস। সেসব বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন নাজিম উদ্দিন। গতকাল সোমবার (১১ মে) পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনাল-১-এ তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
৪৮ বছর বয়সী নাজিমের বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে। একসময় যুবদলের পৌর শাখার দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যবসা করছেন। ২০১৩ সালে তিনি দুই বছরের জন্য মালয়েশিয়ায় যান। ২০১৫ সালের আগস্টে দেশে ফেরেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার পাশাপাশি ফেসবুকে আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিপক্ষে লেখালেখি করতেন এই বিএনপি নেতা। এই কারণেই অনেকে তাকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে ব্যবসা শুরু করার কথা বলে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।
জবানবন্দিতে নাজিম বলেন, ২০১৬ সালে মিরপুর ডিওএইচএসে একটি অফিস ভাড়া নিই। একই বছরের ২৫ মে বেলা ১১টায় মিরপুর-১২ নম্বরের বিআরটিএ বাসস্ট্যান্ডের বিপরীত দিকে মোল্লা টাওয়ার থেকে অফিস ভাড়া সংক্রান্ত চুক্তিনামার কিছু কাগজপত্র ফটোকপি করে বের হই। মোল্লা টাওয়ারের সামনে রাখা নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হওয়ার সময় কালো রঙের একটি মাইক্রোবাস আমার গতিরোধ করে। কয়েকজন গাড়ি থেকে বের হয়ে আমার ঘাড় ধরে ফেলেন। নাম নাজিম বলতেই অস্ত্র দেখিয়ে আমাকে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। সঙ্গে থাকা এক লাখ টাকা, দুটি আইফোন ও কিছু জরুরি কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে দুই হাত পেছনমোড়া করে হাতকড়া পরিয়ে এবং কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ফেলে জমটুপি লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ১০-১২ মিনিট গাড়ি চলার পর থামিয়ে আমাকে একটি ভবনে ওঠানো হয়।
“ভবনে তোলার সময় গেট খোলার শব্দ পাই। আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরিয়ে চেয়ারে বসানো হয়। সেখানে ‘নাজিম উদ্দিন’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি কে চালান, তা জিজ্ঞাসা করা হয়। ‘আমি চালাই’ বলতেই তারা একটি লাঠি দিয়ে পিঠসহ সারা শরীরে আঘাত করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর হাত ও চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে আট ফুটের একটি সেলে ঢোকানো হয়। ওই কক্ষের এক কোণায় কাঠের চৌকি ছিল। দেওয়ালে বিভিন্ন মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর ও আর্তনাদের চিহ্ন ছিল। এর মধ্যে একটি লেখা ছিল ‘এটা ডিজিএফআইয়ের হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল’।”
মাঝেমধ্যে পাশের মসজিদ থেকে কাফরুলের মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পেতেন নাজিম। প্রতিনিয়ত বিমান ওঠানামার শব্দও কানে ভেসে আসত।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘বন্দিশালায় থাকতে নিজের জীবনী লেখার জন্য কাগজ-কলম দিয়ে সময় বেঁধে দিতেন অফিসাররা। সময়ের ভেতরে লেখা শেষ করতে না পারলে ঘুমাতে দেওয়া হতো না। প্রথম ১০ দিনে চারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তীতে ১৫-২০ দিন পরপর করা হতো। কেন আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি, তা জানতে চাইতেন তারা।’
পাশাপাশি তার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে কারা কারা জড়িত আছেন, তাও জানতে চাওয়া হতো। ‘কারও সঙ্গে সম্পর্ক নেই’ বললে নির্যাতন করা হতো।
এক দিন সেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাজিম। তখন বাঁ পাশ থেকে একজন নাম জিজ্ঞাসা করেন। এতে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ছাড়াও আশপাশে আরও অনেকেই বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বাঁ পাশের সেলে বাড্ডার লিটন, তেহজীব এবং ডান পাশে শামীম ও তোজো ছিলেন। সেলের ঠিক বিপরীতে পাঁচটি কক্ষ ছিল। সেখানে আবুজর, ইবতেশাম সামি, মামুন ও হাসানকে রাখা হয়েছিল।
নাজিম বলেন, “এক দিন আমার প্রবল মাথাব্যথা হলে দেওয়ালে আঘাত করতে থাকি। ওই দিন গভীর রাতে আমাকে হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে নিয়ে যান তারা। বলা হয়, ‘আপনি যখন বাইরে ছিলেন, তখন কি খালে-বিলে বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পাননি? আপনি কি দেখেননি যে ওই সময় ট্রেনলাইনে অতিরিক্ত মৃত মানুষের লাশ পাওয়া যায়? আপনি যদি আর কখনও এমন করেন, তাহলে আপনাকে বস্তার ভেতরে ভরে পুকুরে ফেলে দেব।’ এরপর কিছু ‘নসিহত’ করে আমাকে আবার সেলে নিয়ে আসেন অফিসাররা।”
‘পাঁচ মাস পর এক দিন বিকেলে আমাকে প্যান্ট ও গেঞ্জি দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। ওই দিন গভীর রাতে চোখ বেঁধে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে একটি গাড়িতে তোলেন তারা। ২৫-৩০ মিনিট চালানোর পর এক জায়গায় গাড়িটি থামে। সেখানে তিনটি সিঁড়ি বেয়ে একটি কক্ষে নেওয়া হয়। জায়গাটি ছিল র্যাব-২-এর কার্যালয়।’
এখানে আটকে রাখার কয়েক দিন পর র্যাব-১০-এ নিয়ে যাওয়া হয় নাজিমকে। সেখানে বাথরুমে আটকে রাখা হয়। বাথরুমটি সিসি ক্যামেরার আওতায় ছিল। এর মধ্যে এক দিন ভোরে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে চট্টগ্রামে র্যাব-৭-এ হস্তান্তর করা হয়। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর। মাইক্রোবাসটি আকবর শাহ থানাধীন কর্নেল হাট এলাকায় গিয়ে থামলে চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে এবং পেছন থেকে দুই হাত সামনে এনে হাতকড়া পরানো হয়।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, ‘গাড়ি থেকে নামিয়ে সামান্য হেঁটে এক জায়গায় দাঁড় করানো হয়। সেখানে একটি কাপড় বিছিয়ে দুটি ব্যাগ, দুটি পিস্তল ও কিছু গুলি রেখে ছবি তোলা হয়। একপর্যায়ে ফের গাড়িতে উঠিয়ে চোখ বেঁধে ১০-১৫ মিনিট পর মুকিম তালুকদারের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই আবুজর, ইবতেশাম সামি ও নূর আলমকে আটকে রাখা হয়েছিল। এরপর আমাদের নিচে নামিয়ে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করা হয়। ওই দিন রাত ৩টার সময় আকবর শাহ থানায় আমাদের হস্তান্তর করেন র্যাব সদস্যরা। আমার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।’
১৮ মাস জেল খাটার পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান বিএনপির এই নেতা। বাড়িতে যাওয়ার পর শুরু হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অত্যাচার। এছাড়া, প্রশাসনের ঝামেলার কারণে দেশ ছেড়ে সৌদি আরব চলে যান তিনি। ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।
জবানবন্দির শেষে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিজের গুম, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার জন্য দায়ীদের বিচার চান নাজিম উদ্দিন। আর এসব কথা বলতে গিয়ে বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.webp)

.webp)



.webp)
.webp)

