চাকরি ছেড়ে গড়ে তোলেন ‘গরবা গুদি’, এখন সফল উদ্যোক্তা নীলা চাকমা
স্নাতক শেষে দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন প্রায় সাড়ে তিন বছর। তবে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে একসময় ছেড়ে দেন চাকরি। হাতে নগদ টাকা নেই, তাই কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। পরিচিত একজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়ে নিজের ভিটেমাটিতে গড়ে তোলেন তিনটি মাচাং ঘর। শণ, বাঁশ, গাছ দিয়ে গড়ে তোলা মাচাং ঘরটি নির্মাণে কোনো শ্রমিক কাজ করেননি, ঘরে থাকা ভাই আর মায়ের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন তিনি। এরপর সেই তিন মাচাং ঘর আর নিজেদের থাকার ঘরের একাংশ নিয়ে শুরু হয় অতিথিশালা। এখন সেই অতিথিশালা ঘিরে সফল উদ্যোক্তাদের একজন নীলা চাকমা।
নীলা চাকমার বাড়ি রাঙামাটি সদর উপজেলার মঘবান ইউনিয়নের দোখাইয়া এলাকায়। নিজের ভিটেমাটিতে গড়ে তোলা তাঁর অতিথিশালার নাম ‘গরবা গুদি’। চাকমা ভাষায় ‘গরবা’ মানে ‘অতিথি’, ‘গুদি’ অর্থ ‘কক্ষ’। গরবা গুদির যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
রাঙামাটি থেকে সড়কপথে কাপ্তাইয়ের ধনপাতা বনবিহারের কাছাকাছি এলাকায় পৌঁছানোর পর সেখান থেকে নৌকায় যেতে হয় গরবা গুদিতে। কাপ্তাই নেভি ক্যাম্প ও জীবতলী আর্মি ক্যাম্পের ঘাট থেকেও নৌযানে এই অতিথিশালায় যাওয়া যায়।
কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশির মাঝখানে ছোট্ট দ্বীপের মতো এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে গরবা গুদি। শুরুতে এই অতিথিশালায় পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা ছিল না। কেবল দিনভর মাচাং ঘরে কাটানো আর আহারের ব্যবস্থা ছিল। তবে বেড়াতে আসা পর্যটকদের পীড়াপীড়িতেই একসময় রাতযাপনের ব্যবস্থা হয় অতিথিশালায়।
নীলা চাকমা বলেন, ‘প্রথমে এক-দুজন করে পর্যটক আসতেন। চারপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ দেখে তাঁদের অনেকেই মাচাং ঘরে রাতযাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। একসময় পর্যটকদের পীড়াপীড়িতেই ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে দুটি মাচাং ঘরে পর্যটকদের রাতযাপনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে পর্যটকদের থাকতে খুব কষ্ট হতো। পরে কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও পাঁচটি মাচাং ঘর রাতযাপনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে।’

অতিথিদের জন্য নির্মাণ করা মাচাংঘর
ছবি: নীলা চাকমার সৌজন্যে
তবে এখনো পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না জানিয়ে নীলা বলেন, ‘পর্যটকেরা বুকিং কনফার্ম করার আগেই তাঁদের এখানকার সুবিধা-অসুবিধা সব জানিয়ে দেওয়া হয়। সবকিছু অবহিত করে বুকিং কনফার্ম করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘চারদিকে চাকচিক্যময় রিসোর্টের ভিড়ে আমাদের ব্যবস্থা খুবই সাদামাটা। গরবা গুদিতে গ্রামের পরিবেশটা পাওয়া যায়। আমরা চাই, গরবারা পাখির ডাক শুনুক, গাছের পাতা ঝরার দৃশ্য দেখুক, মাটিতে হাঁটুক, মাটির চুলার রান্নার স্বাদ গ্রহণ করুক। কোটি টাকার কটেজে এসব সুবিধা তো আর নিশ্চিত করা যাবে না।’
এখন গরবা গুদিতে দিন দিন পর্যটক বাড়ছে জানিয়ে নীলা বলেন, গ্রামে হওয়ার পরও তাঁর অতিথিশালায় পর্যটকদের সমাগম লেগেই থাকে। অনেক সময় বুকিং নেওয়াও সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ‘রিসোর্ট বলতে যা বোঝায়, তা করার ইচ্ছা আমাদের নেই। তবে হোম স্টের জন্য সরকারিভাবে কোনো কাগজপত্র করা যায় না। বাধ্য হয়ে রিসোর্ট বলতে হচ্ছে।’
নীলা স্নাতক শেষ করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। এরপর সেখান থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন তিনি। বলেন, শূন্য হাতে শুরু করলেও এখন গরবা গুদিতে তাঁর পুঁজি রয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকার মতো। এটি ঘিরে নিজের এবং তাঁর মা ও ভাইয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর বাইরে পর্যটক সমাগমের ভিত্তিতে গরবা গুদিতে দৈনিক পাঁচ-ছয়জন কর্মচারী কাজ করেন। নীলা বলেন, ‘চাকরির পরিবর্তে নিজের মতো করে কিছু করার মধ্যে আলাদা আনন্দ পাওয়া যায়। তরুণদের উচিত বেকার বসে না থেকে কিছু একটা করা, হতে পারে সেটি শাকসবজির চাষাবাদ করে আয়। আর যাঁরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাঁরা চাইলে পড়ালেখার সঙ্গেই এ ধরনের আয়বর্ধক কিছু করতে পারেন।’
মঘবান ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কিরণময় চাকমা বলেন, নীলা চাকমা এখন সফল নারী উদ্যোক্তাদের একজন। তাঁর গরবা গুদি দেখে এলাকার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নতুন কিছু করার উৎসাহ তৈরি হচ্ছে।
সূত্র: প্রথম আলো










