দ্রুত এলপিজি আমদানির পথ খুঁজছে বিপিসি
দেশে চলমান সংকট ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির উৎস খুঁজতে শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে প্রথমবারের মতো এলপিজি আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ১১টি দেশে চিঠি পাঠিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থা।
বিপিসি সূত্র জানায়, সৌদি আরব, আজারবাইজান, আলজেরিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ওমান, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১২টি সরকারি কোম্পানির কাছে এলপিজি সরবরাহের আগ্রহ, শর্ত ও সক্ষমতা জানতে চাওয়া হয়েছে। ২১ ও ২৪ জানুয়ারি এসব কোম্পানির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিপিসি।
বিপিসির এমনই একটি চিঠিতে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিনকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদার কথা জানিয়ে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এলপিজি বাজারে সরবরাহ-ঘাটতির পাশাপাশি অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাস্তবতায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে সম্ভাব্য সরবরাহকাঠামো, জাহাজব্যবস্থা ও খালাসপ্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। বিপিসি দুটি বিকল্প বিবেচনায় রেখেছে। প্রথমটি তুলনামূলক ছোট চালান—৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টন এলপিজি, যা সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করা হবে। এই বিকল্পে আনুমানিক ১০ দিনের সময়সীমা (লে-টাইম) ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিকল্পটি বড় পরিসরের। এতে প্রতি মাসে এক চালানে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানির কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা রাখতে হবে। বিপিসির হিসাবে, এ ধরনের একটি চালান পুরোপুরি খালাসে সময় লাগতে পারে প্রায় ২৫ দিন।
আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জাহাজের ব্যবস্থা, লাইটারিং সক্ষমতা ও দাম—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্পই বেছে নেওয়া হবে।
এ কে এম আজাদুর রহমান, পরিচালক, বিপিসি
সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে বিপিসি আপাতত কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকছে না। যে দেশ বা কোম্পানি নির্ধারিত শর্ত মেনে দ্রুত সরবরাহ করতে পারবে, তাদের কাছ থেকেই এলপিজি আনার কৌশল নিয়েছে সংস্থাটি। সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও আজারবাইজানের কোম্পানিগুলোকে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে তাদের মতামত জানাতে বলা হয়েছে। অন্য দেশগুলোর কাছেও দ্রুত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে অনুরোধ করেছে বিপিসি।
বিপিসির চিঠিতে জাহাজের প্রাপ্যতা, লাইটারিং সক্ষমতা, খালাসে সময় ও বড় আকারের চালান সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে জাহাজসংকট চলছে, পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় কম দামে চুক্তি করলেও যদি গ্যাস সময়মতো দেশে আনা না যায়, তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। এ কারণেই বিপিসি একাধিক দেশের কাছে একই ধরনের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেখছে, কে কত দ্রুত, কোন শর্তে এবং কী পরিমাণ এলপিজি সরবরাহ করতে পারবে।
আমরা বিপিসির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছি। বিপিসিকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রায় সব কোম্পানিই বিপিসির কাছ থেকে এলপিজি নিতে আগ্রহী।
আমিরুল হক, সভাপতি, লোয়াব
জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক এ কে এম আজাদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা দেখতে চাই, কোন দেশ কী শর্তে, কত দ্রুত এলপিজি দিতে পারবে। জাহাজের ব্যবস্থা, লাইটারিং সক্ষমতা ও দাম—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্পই বেছে নেওয়া হবে।’
আগ্রহীদের তালিকা হচ্ছে
১০ জানুয়ারি এলপিজি আমদানির অনুমতি চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেয় বিপিসি। সেখানে বলা হয়, দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় সংকটের সময় সরকারিভাবে বাজারে হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ জানুয়ারি সরকার নীতিগতভাবে জিটুজি ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির জন্য বিপিসিকে অনুমোদন দেয়। ২১ জানুয়ারি তিনটি শর্তে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের চিঠিও হাতে পায় বিপিসি।
অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, বিপিসিকে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সঙ্গে আলোচনা করে কোন কোন বেসরকারি অপারেটর আমদানি করা এলপিজি নেবে, তার তালিকা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, বিপিসি কোনো ধরনের বোতলজাতকরণ বা সরাসরি বিপণন কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবে না। আমদানি করা বাল্ক এলপিজি কেবল অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের কাছেই সরবরাহ করতে হবে।
এ বাস্তবতায় গত এক সপ্তাহে বিপিসি এলপিজি খাতের বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে বড় আকারের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত ছোট অপারেটররাও অংশ নিয়েছে। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি আমদানি বন্ধ রেখেছে, তারাও আলোচনায় অংশ নেয়।
যেসব শর্তে আমদানির অনুমতি বিপিসিকে
* সরকারি পর্যায়ে আমদানির জন্য ২১ জানুয়ারি অনুমতি পেয়েছে বিপিসি।
* অনুমোদনের শর্তে বলা হয়েছে, সংস্থাটি বোতলজাতকরণ বা সরাসরি বিপণনে যুক্ত হতে পারবে না।
* বিপিসির কাছ থেকে কারা এলপিজি কিনবে, তার তালিকা করতে হবে।
* আমদানি করা বাল্ক এলপিজি অনুমোদিত বেসরকারি অপারেটরদের কাছেই সরবরাহ করতে হবে।
বিপিসি সূত্র জানায়, কে কতটুকু এলপিজি নিতে আগ্রহী, কার কী ধরনের সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা আছে এবং সংকটের সময়ে কারা দ্রুত বাজারে সরবরাহ দিতে পারবে—এসব বিষয় যাচাই করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কোম্পানি বিপিসি থেকে এলপিজি নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দেশে এলপিজি ব্যবসার নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫২টি। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট আছে। আমদানি করার সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। গত বছর কোনো না কোনো মাসে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। তবে প্রতি মাসে নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শুরুতে আমদানি করলেও শেষ দিকে কেউ কেউ আমদানি বন্ধ রাখে। মূলত আমদানি কমে যাওয়ার কারণেই সম্প্রতি দেশে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ইতিমধ্যে বিপিসির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। বিপিসিকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রায় সব কোম্পানিই বিপিসির কাছ থেকে এলপিজি নিতে আগ্রহী।
বড় হচ্ছে বাজার
দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা এখন প্রায় ১৭ লাখ টনে পৌঁছেছে। চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বাজারটি এখনো প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশের এলপিজির বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। আমদানির বাজারে প্রথমবারের মতো শীর্ষে উঠেছে মেঘনা গ্রুপের মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, তাদের দখলে বাজারের ১৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইউনাইটেড আইগ্যাস এলপিজি (১৬ শতাংশ), যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার (১৪ শতাংশ), ওমেরা পেট্রোলিয়াম (১২ শতাংশ) ও বিএম এনার্জি (বিডি) লিমিটেড (১০ শতাংশ)।
সূত্র: প্রথম আলো










